/আমাদের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট

আমাদের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-

সাতকোটি সন্তানের হে বঙ্গ জননী

রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি

কবিগুরুর সেই কথার উত্তর দিয়েছিলেন আমাদের বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেই বলেছিলেন, কবিগুরু আপনি দেখে যান আমার বাঙালি আজ স্বাধীন ও মানুষ হয়েছে। আপনি একদিন যে কথা বলেছিলেন আজ তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা মানুষ হতে জানে আজ সারাবিশ্ব দেখেছে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বিশ্বের বুকে স্থান করে নিয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ ‘বাংলাদেশ’। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন অনেক আগে থেকেই বাঙালি নেতাগণ দেখেছিলেন এবং তারা বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র হবেই। বাংলাদেশ সৃষ্টির পিছনে যার বেশি অবদান রয়েছে এবং যার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি, তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার অদম্য সাহস ও উদ্দীপনার গুণেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর হাঁটু কেঁপেছিল। তাদের মধ্যে সর্বদা একটি ভয় কাজ করত বাঙালিরা শাসন ক্ষমতা পেলে কি যে করে ফেলে? কোনো ক্রমেই তাদের কাছে দেশের শাসন ক্ষমতা দেয়া যাবেনা। অর্থাৎ বাঙালিদেরকে সম্পূর্ণরূপে শাসন ক্ষমতার বাইরে রাখতে হবে। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী আদৌ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলনা। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করার পরেও যখন বঙ্গবন্ধুকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ক্ষমতা দেয় নাই তখন তিনি বাধ্য হয়ে স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সে ভাষণের মধ্যে বাঙালি জাতির অনেক দিনের মনের কথা ছিল। প্রকৃত স্বাধীনতা ঘোষণা ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ হয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, প্রত্যেকের ঘরে, ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে শক্রর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল মূলত: বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শাশ্বত প্রেরণার উৎস এবং প্রতীক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের আহবান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি অহিংস, আসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি দেন, যা বাংলাদেশের সর্বত্র স্বতস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে। তিনি বেসামরিক প্রশাসন চালু করার জন্য ৩৫টি বিধি জারি করেন। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ থেকে পূর্ব বাংলা মূলত তার নির্দেশেই চলতে থাকে। সেদিন ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িটি ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের সকল আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বা উৎস। মানুষ অতি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকত সেখান থেকে কি নির্দেশ আসে? দেশের বাস্তব সার্বভৌমত্ব যখন জনগণের হাতে এমনি এক পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া খান পরিকল্পনা মত ১৫ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় আসেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানান। ১৬ই মার্চ থেকে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও আলোচনায় অংশ নেন। ভুট্টো ছয়দফা সংশোধন এবং ক্ষমতার অংশদারীত্ব দাবি করেন। বঙ্গবন্ধুও ছয়দফার প্রতি অটল থাকেন। তিনি কোনোক্রমেই ছয় দফা পরিবর্তন করতে রাজি নন। এদিকে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে থাকে। প্রকৃত পক্ষে, আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও রশদ নিয়ে আসাই ছিল পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সারাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। নেতৃবৃন্দের আহবানে চট্টগ্রাম জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে শ্রমিকরা অস্বীকার করে। ২৩শে মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে ঘরে, ঘরে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৪শে মার্চ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সঙ্কট সমাধানের লক্ষ্যে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ২ ঘণ্টা আলোচনা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ২৫শে মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে পূর্ব বাংলায় সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেন আমি শুধু বাংলার মাটি চাই, মানুষ নয়। ফলে, শুরু হয়ে যায় ২৫শে মার্চের নির্মম হত্যাকা-। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত লেখক রবার্ট পেইন তাঁর চাঞ্চল্যকর ম্যাসাকার MASSACRE (নির্দয় হত্যাকা-) পুস্তকে লিখেছেন, … মাঝরাত নাগাদ তিনি (মুজিব) বুঝতে পারলেন যে, ঘটনা প্রবাহের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তার টেলিফোনটা অবিরাম বেজে চলছে, কামানের গোলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে আর দূর থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। তখনও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, কিন্তু তিনি জানতেন যে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর ব্যারাকগুলো এবং রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার আক্রান্ত হয়েছে। এর এক মাত্র অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বাঙালি সশস্ত্রবাহিনীর ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধ পরিকর। তাই সে রাতেই ২৬ই মার্চ তিনি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। সর্বত্র বেতারযোগে পাঠাবার জন্য তিনি টেলিফোনে নিম্নোক্ত বাণীটি সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জনৈক বন্ধুকে ডিকটেশন দিলেন-

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম এম.এ হান্নানের কাছে এই বাণী যথা সময়ে পৌঁছেছিলো।

The Pakistani Army has attacked police lines at Rajarbagh and east Pakistan Rifels Headquarters at pilkhana at midnight. Gather strength to resist and prepare for a war of independence” (Massacre by Robert payne-page 24: The Macmillan company New york) পাকিস্তান সামরিক বাহিনী মাঝরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানায় পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস-এর হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করেছে। প্রতিরোধ করার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য শক্তি সঞ্চয় করুন (ম্যাসাকার রবার্ট পেইন। পৃষ্ঠা ২৪ দি ম্যাকমিলান কোম্পানির নিউইয়র্ক। ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য আহবান জানিয়ে তাঁর এই সর্বশেষ বাণী প্রেরণ করলেন তখন ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৬শে মার্চ শুরু হয়ে গেছে। এজন্যই ২৬ মার্চ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এ ব্যাপারে একাত্তরের মার্চ মাসে চট্টগ্রামে অবস্থানরত দু’জন সামরিক অফিসার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম এবং মেজর মীর শওকতের (বর্তমানে পরলোকগত অব. লে জেনারেল) ভাষ্য হচ্ছে, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম এম এ হান্নানের কাছে বঙ্গবন্ধুর উল্লেখিত বার্তা যথাসময়ে পৌঁছেছিলো এবং তিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত বাণীর বরাত দিয়ে এক ভাষণ প্রচার করেন। এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলে অবস্থার মোকাবেলায় স্টাফ আর্টিস্ট বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে জনাকয়েক দুঃসাহী বেতারকর্মী বন্দর নগরীর অপর প্রান্তে কালুর ঘাটস্থ ট্রান্সমিটারে সংগঠিত করলেন, বিপ্লবী স্বাধীন বাংলাবেতার কেন্দ্র। ২৬ শে মার্চ সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট এই ঐতিহাসিক বেতার কেন্দ্রের স্বল্পকালীন অনুষ্ঠান শুরু হয়। এই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রেরিত স্বাধীনতা বাণীর বাংলা অনুবাদ পাঠ করলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম সন্দ্বিপ। তখন বাংলাদেশের সর্বত্র শুরু হয়েছে রক্তাক্ত লড়াই। পরদিন অর্থাৎ ২৭শে মার্চ এই বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সন্ধ্যাকালীন অধিবেশনের অনুষ্ঠান আবার ইথার তরঙ্গে ভেসে এলো। এবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা পত্র প্রচার করলেন তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিঃ মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীকালে সেক্টর কমান্ডার, সেনা প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি) ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষাটি ছিল নিম্নরূপ :

The Government of the sovereign state of Bangladesh. On behalf of our Great Leader, The supreme Commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman, We hereby proclaim the independence of Bangladesh And that the Government headed by. Sheikh Mujibu Rahman has already been formed. It is further proclaimed that sheikh Mujibu Rahman is the sole leader of the elected representatives of Seventy Five Million People of Bangladesh, and the Government headed by him is the only legitimate government of the people of the Independent sovereign State of Bangladesh, which is legally and constitutionally formed and is worthy of being recognised by all the governments of the world. I therefore, appeal on behalf of our Great Leader Sheikh Mujibur Rahman to the Governments of all the democratic countries of the world, specially the big powers and the neighboring countries to recognise the legal government of Bangladesh and take effective steps to stop immediately the aweful genocide that has been carried on by the army of occupation from Pakistan.

The guiding principle of the new state will be first neutrality, second peace and third friendship to all and enmity to one. May Allah help us. Joy Bangla (আমি বিজয় দেখেছি পৃষ্ঠা ১৫, ১৬ এম. আর, আখতার মুকুল) ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের নিকট গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই মধ্য রাতের পর অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি ঢাকার দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং ওয়্যারলেস যোগে চট্টগ্রামের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের নিকট স্বাধীনতার ঘোষণা পৌঁছে দিয়ে তা প্রচারের নির্দেশ দেন।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !