খাদ্যে ভেজাল থেকে মুক্তি চাই

ভেজাল এবং ওজন ….টমেটো থেকে আলু, কলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সাকসব্জি এবং ফলমূল সবকিছুতে লেগেছে রাসায়নিকের ছোবল। কোনোটিকে পাকানোর জন্য, কোনোটিকে তাজা রাখার জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হয়। মানবশরীরের জন্য এইসব রাসায়নিক ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বা ভেজালকারী ব্যক্তিদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
ক্রেতা অধিকার সংরক্ষণ নামের একটি সংস্থা বার বার জন-সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে। জনসাধারণেরও যেন সাম্প্রতিক সময়ে ভেজাল বিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং শাস্তিও দেয়া হচ্ছে।
খাদ্যে ভেজাল এবং ওজন ……খাদ্যে ভেজাল আর ওজনে কম দেয়ার মধ্যে দেশে যেন এক প্রতিযোগিতা চলছে। এখন বাজার করতে গেলে কিনতে গেলে এই সন্দেহ বা সত্যিটি মনের মধ্যে আসে। কিন্তু কিছু করার থাকে না। যদি কোনো কোনো বাজারে সিটি কর্পোরেশনের ওজনের দাড়িপাল্লা বাজারের মাঝখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। এখানে ওজন করে প্রতিবাদ করা মানেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনা – এ হচ্ছে একজন ক্রেতার মন্তব্য। কারণ ভেজাল ও ওজন কম দেয়ার ক্ষেত্রে ওরা একতাবদ্ধ। প্রতিবাদে গণপিটুনী খাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে কাপড়-চোপড়ে যদি একটু গরীবী ভাব থাকে। এখন আর সেই দিন নেই বাজারে পুলিশ ওজন পরিমাপক যন্ত্র নিয়ে বসে এবং সাথে সাথে অপরাধীর শাস্তি দিয়ে থাকে। তবে, আমরা নিজের গাফলতির কারণে এসব সুযোগগুলো গ্রহণ করি না, বিক্রেতাও আমাদের গাফলতির সুযোগ সদব্যবহার করে।
ভেজাল খাদ্য ……..ভেজাল খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। রাষ্ট্রযন্ত্রও তা জানে। বর্তমানে খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি নিত্য নৈতিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছি। চাউল, আটা, লবন, চিনি, ভোজ্য তেল, আলু দুধ থেকে শুরু করে রুটি, কেক, মিষ্টি, বিস্কুট কিছুই বাদ যায় না। খাদ্যে রং ব্যবহার নিয়ে কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না। বেশ কিছুকাল আগের একটি দৈনিক সূত্রে জানতে পারি, মহাখালী পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের খাদ্য পরীক্ষাগারের তথ্যানুযায়ী দেশের ৪৫ ভাগ এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুযায়ী দেশের ৫৪ ভাগ খাবারে ভেজাল। এসব খাদ্যদ্রব্য অবিকৃত এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য এতে এক ধরণের কেমিক্যাল মেশানো হয়। চিকিৎসর মতে, এধরণের মিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য খাওয়ার ফলে লিভার ও কিডনীর ক্ষতি এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা ও ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তা ছাড়া ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে জ-িস, টাইফয়েড, আমাশয়, পেটের পীড়া এবং বিভিন্ন কঠিন রোগের শিকার হতে হয়। এরজন্য ভেজালকারীর কোনো শাস্তি হয় না।
ভোজ্য তেল ……. ভোজ্যতেলের ভেজাল নিয়ে ক্রেতা সাধারণের মারাত্মক অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই। ভোজ্যতেলের মধ্যে সব চাইতে বেশী আমরা করে থাকি সয়াবিন। সে সয়াবিন নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে। সয়াবিনের সাথে ভেজাল দেয়ার জন্য সাধারণত ব্যবহার করে স্প্যা-েল অয়েল। এই স্প্যা-ল অয়েল ব্যবহার করা হয় মেশিনের যন্ত্রাংশ পরিষ্কার করার জন্য। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে এক প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে সয়াবিন তেলকে ঝাঁজযুক্ত করে সরিষার তেল হিসেব বাজারে বিক্রি করা হয়। এই তেল ঝাঁজের কারণে আমাদের কাছে খাঁটি সরিষার তেল হিসেবে জনপ্রিয় লাভ করেছে। মুড়ি দিয়ে খেতে বেশ ভালই লাগে। দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিষাক্ত স্প্যা-েল অয়েল মিশ্রিত ভোজ্যতেল খেয়ে প্রায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় হাজার হাজার মানুষ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের বিষাক্ত তেল সেবনে মানবদেহের লিভার এবং কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
মুড়িতেও ভেজাল …….তেল দিয়ে মুড়ি খেতে ভাললাগার কথা জানিয়েছি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে সে মুড়িতেও ভেজাল। আমরা অনেকেই বিভিন্ন রোগ থেকে বাঁচার জন্য রোগীকে মুড়ি খেতে উপদেশ দিয়ে থাকি। আসলে এই উপদেশের মাধ্যমে আমরা রোগীর উপকারের চেয় ক্ষতি বেশী করছি। মুড়ির ভেজাল সংবাদও পত্র পত্রিকায় প্রায় ছাপা হয় : মুড়ির আকার বড় এবং সুন্দর করার জন্য ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়, যারা মুড়ি ভাজে তারা হয়ত জানে না যে ইউরিয়া কতটা ক্ষতিকর। ইউরিয়া কিডনীসহ শরীরে নানা সমস্যা তৈরী করে।
চালেও ভেজাল ………চালেও ভেজাল এ কোনো নতুন তথ্য নয়, চালে সাথে ছোট ছোট কাঁকড়ের পাশাপাশি এক শ্রেণী ব্যবসায়ী নি¤œমানের চালের সাথে ইউরিয়া সার মিশিয়ে বিক্রি করে। এ ছাড় চালে কাঁচের গুড়ো, কাঁচিক বালুও মিশানো হয়। এই সূত্র থেকে জানতে পারি, উত্তর বঙ্গের বেশ কয়েকটি চাল কলে ধান ভেজানোর সময় ধান ভোজানোর পাত্রে বা হাউজের পানিতে ইউরিয়া মেশানো হয় এবং কোনো কোনো স্থানে ধান ভাঙ্গানোর সময় কল থেকে প্রথমবার চাল বের হলে সেই গরম চালে ইউরিয়া মিশিয়ে তা ভাল করে কচলানো হয়। এতে খুব সহজেই নি¤œমানের চাল হয়ে যায় অত্যন্ত পরিষ্কার এবং দেখতে মনে হয় অনেক উন্নতমানের। কম দামে ভালো চাল মনে করে আমরা নিজেরা ঐ চাল কিনে ঘরে ফিরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে যে ইউরিয়া মেশানো হয় তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইউরিয়া মিশ্রিত চাল বা কোনো খাবার খেলে মারাত্মক পেটের পীড়া ও জটিল রোগ ব্যাধি হতে বাধ্য। এ ফলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। কাঁচের গুঁড়ো, কাঁচিক বালু ইত্যাদিও মানদেহের অনেক ক্ষতি করে এবং এর ফলে পাকস্থলী ও কিডনীর উপর ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া ডিডিটি মানবদেহের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে। এ প্রসঙ্গে বিষেশজ্ঞদের মতামত, ডিডিটি মিশ্রিত এই শুটকি মাছ ভাল করে ধুয়ে রান্না করলেও এর রাসায়নিক গুনাগুন নষ্ট হয় না এবং এর প্রতিক্রিয়ায় মানুষ সাথে সাথে ক্ষতির সম্মুখীন হয় না বা বুঝতে পারে না। ডিডিটি পাউডার খাওয়ার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে প্যারালাইসিস ও পঙ্গুত্বের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী।
আলু এবং এনড্রিন ……. আমরা কি খাবো এবং কি খাবো না – এই সিদ্ধান্ত নেয়াও এখন আমাদের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুকাল আগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিউট রাজশাহী থেকে চোরাপথে আসা কিছু গোল আলু পরীক্ষা করে তাতে জীবনঘাতি রাসায়নিক পদার্থ এনড্রিন পেয়েছেন। গবেষকদের মতে, এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের কার্যকারিতা রান্নার পরেও বহাল থাকে। দেশী আলু তুলনায় এ আলু দেখতে সুন্দর, বড় এবং দামেও সস্তা। তাই জনগণ নিজের অজান্তে এ ধরনের আলু কিনছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এনড্রিন বা এড্রিন মিশ্রিত খাবার খেলে প্যারালাইসিসসহ বিভিন্ন রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে এবং শরীরে বিভিন্ন ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।
পুনশ্চ : ভেজাল আইন ….. ভেজাল ও ওজনে কম দেয়ার আইন থাকলেও তার প্রয়োগ যেমন নেই, শাস্তিও তুলনামূলক খুবই কম। আমরা কখনো ক্রেতা অধিকার সংরক্ষিত হোক এই ব্যাপারে সোচ্চার নই। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠা করে ক্রেতাস্বার্থ সংরক্ষণ করতে হবে। একটি অতিসাধারণ প্রচলিত আইন আছে এই আইন অনুযায়ী ভেজাল মিশ্রনের দায়ে খুব বেশি শাস্তি হয় না। এ ব্যাপারে বার বার কমিটি হয়েছে। কিন্তু কার্যকরভাবে খুব একটা এগাতে পারেনি। ভেজাল খাদ্য আটক বা তদারিক দায়িত্ব প্রাপ্ত সেনিটারী ইন্সপেক্টরদের ভূমিকাও খুবই রহস্যজনক। আমরা জানি ইন্সপেক্টর ও ল্যাবরেটরীর সংখ্যা খুবই কম। আমারা মনে করি অন্তত প্রতি বিভাগী শহরে হলেও খাদ্যের মান পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবরেটরী প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তাহলেই খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
এখানে একটি প্রতিবেদকের প্রস্তাবনা পাঠকের ভরাভরে তুলে ধরা হলো : যেহেতু খাবারের ওপর নির্ভর করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হয় এবং দৈহিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মে, তাই খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণ একটি জঘণ্য ও লজ্জাজনক ব্যাপার। প্রস্তাবনাসমূহ :
ভেজাল খাদ্যের ভয়াবহতা ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য ব্যাপক প্রচারণা ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
খাদ্য আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা এ জঘণ্য কাজে জড়িয়ে পড়তে না পারে।
ভেজাল খাদ্য তদারকি করার জন্য সেনিটারী ইন্সপেক্টরের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে হবে।
খাদ্যদ্রব্যের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ল্যাবরেটরী বাধ্যতামূলকভাবে স্থাপন করতে হবে।
ভেজাল ও বিপদজনক খাদ্য বিক্রেতা ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো মৃত্যুদ-ের আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে।