/গৌরব ও গর্বের ডিসেম্বরে

গৌরব ও গর্বের ডিসেম্বরে

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। আমাদের গর্ব ও গৌরবের মাস। একটি গর্বিত জাতি হিসেবে সগর্বে মাথা উঁচু করে স্পর্ধা অর্জন করেছিলাম আমরা এ মাসেই। সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং আত্মদানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠায় সরল রাজপথে আমরা প্রবেশ করেছি এই ডিসেম্বরেই। তাই জাতির কাছে ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। এ মাসকে আমরা পেয়েছি আমাদের বিকশিত সত্তার উজ্জ্বল প্রতীকরূপে, আমাদের জাতীয় অর্জনের শ্রেষ্ঠতম স্মারক হিসেবে।

আমরা ভুলিনি আমাদের বিজয় এসেছে রক্তসিক্ত পথে। এসেছে এ দেশের শ্রেষ্ঠসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের ছোপ ছোপ রক্তের সিঁড়ি বেয়ে। এক নদী রক্তের তীর ঘেঁষে। নিজেদের রক্তের বিনিময়ে এ বিজয় মিশ্রিত বলেই এটি আমাদের এত কাঙ্ক্ষিত সম্পদ। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পর্যায়ে এত কাম্য। হৃদয় নিংড়ানো স্পন্দন বলেই এত মোহনীয়। হৃদয়ের এত কাছাকাছি। লাল গোলাপের মতো সবার কাছে এত মনলোভা। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমরা জানতাম কেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন।

সন্তান-সন্ততিরা যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, যেন ভাই-বন্ধুরা উদার আবহাওয়ায় বিকশিত হতে পারে, সে জন্যই তো এত রক্তদান। হিংসা-প্রতিহিংসা পীড়িত, নিপীড়ন-নির্যাতন-জর্জরিত পৃথিবীটা যেন স্নেহ-প্রেম-প্রীতির আবহে পূর্ণ হয়ে সুস্থ মানবতার আবাসভূমি হয়ে উঠতে পারে এবং সেই পরিবেশে বেড়ে উঠে নতুন প্রজন্ম যেন পরিপূর্ণতার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বিশ্বময় বিশ্বমানবতার জয়গানে মুখর হয়ে উঠতে পারে, সে জন্যই তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের দৃষ্টিতে ছিল এমনই স্বপ্ন। বর্তমানে মুক্ত বাংলাদেশ, ভবিষ্যতে দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সারাবিশ্বের শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির অন্বেষণে ছিল তাদের স্বপ্ন। এ জন্যই স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ।

বিজয়ের মাস এই ডিসেম্বরে কোনো হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন আছে কি? আছে কি কোনো সূক্ষ্ণ ব্যালান্সশিট তৈরির প্রয়োজন? এই প্রশ্নগুলো বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সামনে এসে দাঁড়ায় বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকীতে। আমরা এই সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময়ে কি আমাদের স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি? প্রয়োজন রয়েছে এসব ভেবে দেখার। গৌরব ও গর্বের এ মাসে নতুন করে এসব ভেবে দেখে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের শ্রেষ্ঠসন্তানরা যা চেয়েছিলেন তার কতটা কাছাকাছি এ জাতি আসতে পেরেছে? জাতীয় জীবন কি ঠিক পথে রয়েছে? আমরা পথভ্রষ্ট হইনি তো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এত সহজ নয়। শুধু এটুকু বলব, আমরা বলেছি, তবে পথ খুব বন্ধুর। খুব অসমতল। তারপরও চলেছি।

এ কথা সত্য, একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশ থেকে আজকের বাংলাদেশ অনেক অগ্রগামী। এর ছাপ যেমন পড়েছে শহরাঞ্চলে, তেমনি পড়েছে গ্রামবাংলায়। বিশেষ করে বছরের পর বছর যে গ্রামীণ জনপদের মানুষ ছিল প্রায় অবচেতন আধা ঘুমে, আধা জাগরণে; সেসব জনপদের মানুষ স্থবিরতা কাটিয়ে উঠেছে। ঘুমের আড়মোড়া কাটিয়ে চলতে শুরু করেছে। শুধু শত শত বছরের সেই সনাতন কৃষিকে আলোকিত করেই নয় বরং জীবনের সর্বক্ষেত্রে আধুনিকতার আলোকে সমুজ্জ্বল হয়ে প্রতিবন্ধকতা জয় করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টির মহোৎসবের নিরিখে। ৮৫ হাজার গ্রামেই বাংলাদেশের হূৎপিণ্ড স্পন্দিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মানুষগুলো জাতীয় কিংবা স্থানীয়ভাবে কতটা মূল্যায়িত হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে? তাদের অবদান আমাদের জাতীয় জীবনে সীমাহীন বটে। কিন্তু তাদের মতামতের মূল্যায়ন কতটা আমাদের নীতিনির্ধারকরা দিয়ে থাকেন, তা তারাই ভালো জানেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাত কি সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। জন্মহার হ্রাস পায়নি; তবে মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। মাতৃমৃত্যুও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে এ দেশের নারী সমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কিন্তু তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা ক্রমেই প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে এখনও নারী সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সনাতন ব্যবস্থায় বাস করেও তারা অত্যন্ত সচেতন। তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের উপস্থিতি কর্মক্ষেত্রে নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসনসহ নানা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আশা-জাগানিয়া। কিন্তু তারপরও নারী সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যা যা করা দরকার সেসব ক্ষেত্রে এখনও বহু কাজ রয়ে গেছে। এখনও ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে কিশোরী-যুবতী বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ- এ থেকে লজ্জা ও গ্লানির বিষয় আর কী হতে পারে!

মুক্তিযুদ্ধেও আমাদের মা-বোনদের যে অবদান, তা গভীর শ্রদ্ধাভরেই স্মরণ করতে হয়। তাদের স্নেহ-ভালোবাসা-অনুপ্রেরণা-সহযোগিতায় আমাদের অকুতোভয়, মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সফল পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে জাতিকে নতুন ঠিকানা উপহার দিয়েছেন, তা তো ঐতিহাসিক। এ দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরই তাদের সহায়তায় রূপান্তরিত হয় একেকটা দুর্গে। তাই তো চারদিকে অসংখ্য রক্তস্রোত সৃষ্টি করে মাত্র নয় মাসেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তিপত্তন করেছিলেন মুক্তিকামী বীরযোদ্ধারা।

গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। ঋণ নিয়ে ঋণখেলাপি হওয়ার ঐতিহ্য তাদের নেই। রাতারাতি লুটপাটের মাধ্যমে কুঁড়েঘর ছেড়ে প্রাসাদে ওঠার ঐতিহ্যও তাদের নেই। তাই বাংলাদেশ যখন দুর্নীতিতে একাধিকবার শীর্ষস্থানের অধিকারী, তখন তারা বিমূঢ় হয়েছিল। এখনও দুর্নীতি হচ্ছে বহু ক্ষেত্রে, নানা কায়দা-কৌশলে। অসাধু-দুর্নীতিবাজদের মূলোৎপাটনে সরকারের তরফে নানা রকম অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি অহরহ ব্যক্ত হয় বটে; কিন্তু দুর্নীতির লাগাম কি টেনে ধরা গেছে? দুর্নীতি কি বন্ধ করা যাচ্ছে? কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে না? হয়তো মাত্রা কমবেশি হতে পারে। কিন্তু দুর্নীতিবাজরা সক্রিয় রয়েছে, এটিই সত্য। বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকীতেও যদি দুর্নীতি নিয়ে আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কীভাবে?

গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ জানে, গতর খাটিয়ে যা অর্জন করা যায় তাই প্রকৃত অর্জন। লুটপাটের দুর্গন্ধময় নর্দমাগুলো বন্ধ হলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব, তারা এটুকু ভালো করেই জানে এবং বুঝে। তারা কিন্তু গতর খাটিয়েই চলেছে। কিন্তু তারপরও অনেক ক্ষেত্রে তাদের অভাব দূর হচ্ছে না। তারা এমতাবস্থায় বুঝতে পারছে কেন তারা পিছিয়ে আছে এবং কারা তাদের সব কেড়ে নিচ্ছে। কারা তাদের সব অর্জন খাচ্ছে। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে কারা লাভবান হচ্ছে। এই অপরাজনীতি জিইয়ে রেখেই স্বার্থান্বেষী মহলের লাভ কী, এও তারা এখন জানে ও বুঝে। জনস্বার্থভিত্তিক, কল্যাণকর সুস্থ রাজনীতির ধারা নিশ্চিত করলেই স্বার্থান্বেষীদের যত ভয়। গণমানুষের জাগরণই কেবল পারে এই অসুস্থ ধারার বিনাশ ঘটাতে।

বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও যে অপরিণত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গৌরব ও গর্বের এই ডিসেম্বরে বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকীতে আজ এই বিষয়ে তো আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলার কথা ছিল না। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা তো এড়ানো যাবে না। জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠ, যেন ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অথচ এমন অবস্থায় সবচেয়ে প্রয়োজন সমতল ভূমির। সমতল ভূমি নিশ্চিত না হলে রাজনীতি যেমন সুস্থ ধারায় ফিরবে না, তেমনি আগামী নির্বাচন হবে না শঙ্কামুক্ত। বিজয়ের এই মাসে আমাদের রাজনীতিকরা নতুন করে সংকল্পবদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতের পথে এগোবেন কি? ডিসেম্বরের তাৎপর্য কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নিশ্চয়ই তারা এটুকু অনুধাবনও করেন। গৌরব ও গর্বের এই ডিসেম্বরে বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকীতে প্রশ্ন রাখতে চাই- আমাদের প্রাণপ্রিয় রাজনীতিকরা কি ঐকমত্যের ভিত গড়ে জাতিকে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানার সন্ধান দিতে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারবেন?

এমাজউদ্দীন আহমদ/সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !