চলে গেলেন আনিসুল হক

চলে গেলেন আনিসুল হক। আকস্মিক তাঁর এই চিরপ্রস্থান। একেবারেই অপ্রত্যাশিত। পঁয়ষট্টি বছর, চলে যাওয়ার মতো কোন বয়সই নয়। তাঁর এই অকালপ্রয়াণে শোকগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষ। কয়েক মাস প্রায় অচেতন ছিলেন তিনি বিলেতের আরোগ্যশালায়। মস্তিষ্কের জটিল ব্যাধিতে ভুগছিলেন। ঢাকাবাসীর, শুধু ঢাকার কথাই বা বলি কেন, সারা দেশের মানুষের শুভ কামনা ছিল তাঁর জন্য; আশা ছিল তিনি আবার ফিরে আসবেন দেশে, তাঁর কর্মক্ষেত্রে। সেই চিরচেনা হাসিমুখ দেখে তাঁর প্রতি লোকের প্রীতি জেগে উঠবে, তাঁর কাছে সব সময়ই ভাল কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা থাকবে। কিন্তু হারাতে হলো তাঁকে, সপ্রতিভ, সদাপ্রাণবন্ত, সতত হাস্যময় আনিসুল হককে। তাঁর জীবনের শেষদিকে দেশবাসীর কাছে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন রাজধানীর সাহসী, গতিময় ও আন্তরিক শ্রমনিষ্ঠ একজন মেয়র বা নগরপিতা হিসেবে। যদিও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তাঁর প্রধান পরিচিতি গড়ে উঠেছিল টেলিভিশনের একজন চৌকস উপস্থাপক হিসেবে। তাঁর অনুষ্ঠান উপভোগ্য বিনোদন ছিল দর্শকের কাছে। এভাবেই তিনি অগণিত দর্শকের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন নায়কের মতো স্বপ্নের মানুষ, কাক্সিক্ষত প্রিয়জন। অবশ্য একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হিসেবেও সমাজে সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর চলে যাওয়া বড় বেদনার মতো বাজছে আজ দেশের মানুষের হৃদয়ে।

বর্ণাঢ্য ছিল আনিসুল হকের কর্মজীবন। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০’র দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তার উপস্থাপনায় ‘আনন্দমেলা’ ও ‘অন্তরালে’ অনুষ্ঠান দুটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের আগে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনও করেছিলেন তিনি। এরপর ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালে বিজিএমইএ’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে বেসরকারী খাতে বিদ্যুত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিআইপিপিএরও সভাপতি ছিলেন।

মাত্র দুই বছরের জন্য মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিলেন আনিসুল হক। এ অল্প সময়ের কাজের জন্যও একজন ব্যতিক্রমী মেয়র হিসেবে ঢাকাবাসী তাঁকে মনে রাখবে বহুদিন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ঢাকার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। দু’বছর আগে দায়িত্বগ্রহণের অল্পকালের ভেতর বিরোধিতার মুখে তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের সড়ক দখলমুক্ত করতে সমর্থ হন। এ ছাড়া গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনে বিশেষ রঙের রিক্সা এবং ‘ঢাকা চাকা’ নামে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস সেবা চালু করে প্রশংসিত হন আনিসুল হক। বিমানবন্দর সড়কে যানজট কমাতে মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ইউলুপ করার উদ্যোগ নেন তিনি। এরই মধ্যে মহাখালী থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

আনিসুল হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা ও সহমর্মিতা।