ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে যারা

আগামী ১১ মে ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব আসবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রলীগে সবচেয়ে মেধাবী, সুদক্ষ, সাহসী, সাংগঠনিক এবং বিরোধীদলের আন্দোলনে যারা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে তাদের মধ্য থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব আসবে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) পদ পেতে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে চলছে লবিং ও তদবির।

বরিশাল অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক আল-নাহিয়ান খান জয়, আপ্যায়ন বিষয়ক উপসম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান, উপ-প্রচার সম্পাদক সাইফুর রহমান সাইফ, সহ-সম্পাদক খাদেমুল বাশার জয়, সহ-সম্পাদক সবুর খান কলিন্স, স্কুলছাত্র বিষয়ক উপ-সম্পাদক অসীম কুমার বৈদ্য ও কৃষি শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক বরকত হোসেন হাওলাদার।

চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার মোহাম্মাদ নিজামুল ইসলাম, সহ-সম্পাদক জায়েদ বিন জলিল, উপ-পাঠাগার সম্পাদক সোহেল উদ্দীন, স্কুল ছাত্রবিষয়ক উপ-সম্পাদক খাজা খায়ের সুজন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক এইচ এম তাজউদ্দিন, ঢাবির স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শামীম।

ফরিদপুর অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক রাকিব হোসেন, সমাজসেবা সম্পাদক রানা হামিদ, ঢাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি বিদ্যুৎ শাহরিয়ার কবির ও স্যার এ এফ রহমান হলের সভাপতি হাফিজুর রহমান।

খুলনা অঞ্চল থেকে আলোচনায় আছেন ঢাবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স, ঢাবি শাখার দপ্তর সম্পাদক ও কবি জসীমউদ্‌দীন হল শাখার গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ ওবায়েদ এবং কেন্দ্রীয় ক্রীড়া বিষয়ক উপসম্পাদক মো. হুসাইন।

উত্তরবঙ্গ থেকে আলোচনায় আছেন আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক হোসাইন সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সহসম্পাদক রাকিবুল ইসলাম।

গুরুত্বপূর্ণ এ চারটি অঞ্চলের বাইরে সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্বে আসতে পারে কেন্দ্রীয় গণশিক্ষা সম্পাদক আনিসুল ইসলাম জুয়েল, ঢাবির মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সভাপতি ইউসুফ উদ্দিন খান, ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আলোচনায় রয়েছেন পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম হাবিবুল্লাহ বিপ্লব, জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস ও ঢাবির সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস।

এদিকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসার যোগ্যতা নিয়ে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যোগ্য এবং মেধাবীরাই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসবেন বলে ঢাবির সম্মেলনে এসে বলেছেন ওবায়দুল কাদের। সম্মেলনে তিনি বলেন, ছাত্রলীগে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। বহিরাগতরাও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। শুধু তাই নয়; দুশ্চরিত্রবানদেরও ছাত্রলীগের কমিটিতে আনা হবে না বলেও জানান তিনি।

ওবায়দুল কাদেরের এই ঘোষণার একদিন পর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের এক বৈঠকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে কারা আসবেন, তা নিয়েও কথা বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সম্মেলনে কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব ও সমর্থনের প্রয়োজন নেই। যোগ্যতার ভিত্তিতে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও মেধার বিবেচনায় সিলেকশন পদ্ধতিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এই কথার ওপর ভিত্তি করে ছাত্রলীগের ঢাবি ও কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতা নির্বাচন করা হবে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এমন বক্তব্যের পর যোগ্য ও মেধাবী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের ফলে অনুপ্রবেশকারীরা মাথাচাড়া দিতে পারবে না। দলের মধ্যে অনেক দক্ষ ও যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছে, যাদের পরিবার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারাই ছাত্রলীগের এই শীর্ষ চার নেতৃত্বে আসতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন বলেছেন, ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে সমাঝোতার চেষ্টা করা হবে। সমঝোতায় নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে,তা প্রেসরিলিজ দিয়েই হবে। আর  না হলে ভোট হবে। তবে যদি দেখা যায়, ভোটের মধ্যে উল্টাপাল্টা আসে, সেটা নিশ্চয়ই গ্রহণযোগ্য হবে না।

এদিকে ঐতিহ্য অনুযায়ী, ছাত্রলীগের সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় দেখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বয়স, নিয়মিত ছাত্র, সংগঠনের জন্য ত্যাগ এবং এলাকা। এ ছাড়া সংগঠন পরিচালনায় দক্ষতাকে এবারের সম্মেলনে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত কয়েকটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে (কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চল থেকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন নেতৃত্বে থাকে। এর বাইরের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাকি দুজন নেতৃত্বে আসছেন। এবারের সম্মেলনকে ঘিরে এই হিসাব ধরেই এগোচ্ছেন প্রার্থীরা।

২৯তম জাতীয় সম্মেলনে (কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) নেতৃত্ব নির্বাচনে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি এলাকার বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বৃহত্তর বরিশাল, চট্টগ্রাম অঞ্চল, উত্তরবঙ্গ ও ফরিদপুর অঞ্চল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এ ছাড়া বৃহত্তর খুলনা, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকেও নেতৃত্ব নির্বাচন হতে পারে।

ছাত্রলীগের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বরিশাল অঞ্চল থেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব আসে। সে বছর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে এ কে এম এনামুল হক শামীমকে সভাপতি (ফরিদপুর অঞ্চল) এবং ইসহাক আলী খান পান্নাকে (বরিশাল অঞ্চল) সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর বরিশাল অঞ্চল থেকে সংগঠনটিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে প্রায় নিয়মিত এই অঞ্চল থেকে নেতৃত্বে এলেও এ বছর কেন্দ্রের নেতৃত্বে এ অঞ্চলটিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

এরপরই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আলোচনায় রয়েছে উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল। ছাত্রলীগের ২৬তম সম্মেলনের মাধ্যমে ২০০৬ সালে উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসে। তখন উত্তরবঙ্গ থেকে মাহমুদুল হাসান রিপনকে সভাপতি ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এরপর ২৭ ও ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে এ দুটি অঞ্চল থেকে আর শীর্ষ নেতৃত্ব আসেনি। ফলে এবারের সম্মেলনের প্রার্থী নির্বাচনে এ দুটি অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৭তম সম্মেলনে বৃহত্তর খুলনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং ২৮তম জাতীয় সম্মেলনে ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসে। ফলে এবারের সম্মেলনে খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে পূর্বের ঐতিহ্য অনুযায়ী ফরিদপুর থেকে একজন নেতৃত্বে আসবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন ২৮তম অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সাইফুর রহমান সোহাগকে সভাপতি ও এস এম জাকির হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।