জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সামাজিক গণমাধ্যমকেও কাজে লাগাতে হবে

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়েছে গতকাল নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। জনসংখ্যা বিষয়ের প্রতি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়ে থাকে। এ দিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো পরিবার-পরিকল্পনার গুরুত্ব, লিঙ্গ বৈষম্য, দারিদ্র্য, মাতৃত্ব স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। কিন্তু বিবিধ কারণে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে জোরদার করার বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ রক্ষা করতে পারছে না বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। খবরে প্রকাশ, ২০১২ সালে লন্ডনে পরিবার পরিকল্পনা শীর্ষ সম্মেলনে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল যোগ দিয়েছিল। মূলত বিশ্বের জনবহুল ৩৮টি দেশ এই সম্মেলনে যোগ দেয়। সম্মেলনে বাংলাদেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল : অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয় এমন জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রীর বিষয়ে প্রশিক্ষণ; সেবার ক্ষেত্রে শহর-গ্রাম ও ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য দূর করা এবং কিশোরীদের উচ্চ গর্ভধারণের হার কমাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ ছাড়া প্রতিবছর পরিবার পরিকল্পনা খাতে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা খরচ করারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দৃশ্যমান নতুন কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি বলে অভিযোগে প্রকাশ। যেহেতু কর্মসূচি চলছে ধীর গতিতে। তাই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৩০ কোটি। ১৩১ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে প্রতিবেশি ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনের কাছাকাছি অবস্থান করছে। চীনের জনসংখ্যা আনুমানিক ১৩৮ কোটি। ২০২২ সালে চীনকে টপকে শীর্ষ ওঠে যাবে ভারত। গত ১০ বছর আগে বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৪ হলেও বর্তমানে তা কমে ১ দশমিক ১৮ তে দাঁড়িয়েছে। তবে আগামী ১২ বছর বিশ্বে এ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নে এটা মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করবে। সমীক্ষা অনুয়াযী, সবচেয়ে বেশি লোক মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ (৪৪০ কোটি) এশিয়ায়, আফ্রিকায় ১৬ শতাংশ (১২০ কোটি), ইউরোপে ১০ শতাংশ (৭৩ দশমিক ৮ কোটি), লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানে ৯ শতাংশ (৬৩ দশমিক ৪ কোটি), উত্তর আমেরিকায় ৫ শতাংশ (৩৫ দশমিক ৮ কোটি) এবং ওশেনিয়ায় বাকি ৩ দশমিক ৯ কোটি মানুষ বাস করে। সমীক্ষায় বলা হয়, জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের বাংলাদেশের অবস্থান আটে। দেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ২৭ লাখ।

স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যাকেই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নানা মত ও ভিন্নমত সত্ত্বেও এখনো বিশেষজ্ঞরা জনসংখ্যাকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেন। দেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ বাস করে বলে পরিসংখ্যানে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জনঘনত্ব ভারতের চেয়ে চার গুণ ও চীনের চেয়ে আট গুণ বেশি। একমাত্র নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর ছাড়া এত বেশি জনঘনত্বের দেশ আর নেই।

জনঘনত্ব বাংলাদেশের ভূমি, পানিসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অবকাঠামোর ওপর চাপ ফেলে চলেছে। মোট প্রজনন হার অর্থাৎ নারীপ্রতি সন্তান জন্ম হচ্ছে ২ দশমিক ৩ জন। এ দুটি হার সাত বছর ধরেই এক জায়গায় স্থির হয়ে রয়েছে। এটা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালে জনসংখ্যা হবে ২০ কোটি। এতে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমবে। এর সঙ্গে জলবায়ুর প্রভাবজনিত সমস্যা যুক্ত হলে জনসংখ্যা তখনো দেশের জন্য বড় সমস্যা হয়েই থাকবে। যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রজনন হার কমানো না গেলেও বৃদ্ধি ঠেকানোকেই একধরনের সফলতা বলে আখ্যায়িত করছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দেশে ২৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দেশে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে বেকার প্রায় ২৬ লাখ। প্রতিবছর এই বেকারত্ব বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বছর শেষে মোট জনসংখ্যার সঙ্গে নতুন করে আরও ১৯ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে। জনসংখ্যার বর্তমান বৃদ্ধির হার অক্ষুন্ন থাকলে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও সামাজিক সমস্যার গণ্ডি থেকে আমরা বের হতে পারবো না। জাতিকে ডুবে থাকতে হবে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক জগতে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্রের পাশাপাশি সামাজিক গণমাধ্যমকেও কাজে লাগাতে হবে। সরকারের কর্মসূচির পাশাপাশি জনগণকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করাতে হবে।