/ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত

বিশেষ প্রতিবেদক

তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘঠিত অপরাধ দমনে নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন করছে সরকার। নতুন আইনটিতে তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। একই পদ্ধতিতে জাতিগত কোন তথ্য প্রচার করে জনবিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলেও তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।  দেশের বাহিরে বসে তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন অপরাধ করলে তা দেশের ভেতরেই বসে করা হয়েছে ধরে নিয়ে বিচার করা হবে প্রণীতব্য এ আইনে। আগামী সোমবার অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনুমোদনের জন্য আইনটি উন্থাপনের জন্য তালিকভূক্ত করা (এজেন্ডাভূক্ত) হয়েছে বলে জানা গেছে।

আইনটিতে শিশুর বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ আইনের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল থাকবে। এছাড়া আইনের আওতায় কর্তৃপক্ষ হিসেবে একটি সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি গঠন করবে সরকার। তবে আইনটি প্রয়োগের সময় তার অপব্যহার হলে তা সরল বিশ্বাসে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার জন্য দেওয়ানী কিংবা ফৌজদারি মামলা করতে পারবে না। সেই ক্ষেত্রে খসড়া আইনটিতে সরল বিশ্বাসের কোন সংজ্ঞা নেই। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ বিষয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত নিয়ে আইনটি চুড়ান্ত করা হয়েছে। অনুমোদনের আগে এর চেয়ে বেশী কিছু বলা ঠিক হবেনা বলেও মন্তব্য করেন তারা। আইনটির চতুর্থ অধ্যায়ে অপরাধ ও দন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই অধ্যায়ের ১৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোন ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ করেন বা সম্প্রচার করেন, যা কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে অথবা করতে পারে তা হলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই ক্ষেত্রে অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড সর্ব নিম্ন ২ মাসের কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। আইন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মের বিষয়ে এক শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য বিভিন্ন সাইটে প্রকাশে করে জনবিশৃঙ্খলা তৈরি করতো। এই আইন কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দৌরাত্ম কমবে বলে আমরা আশা করি।

নতুন করে তৈরি করা আইনটির ২০ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে ওয়েবসাইটে, ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ, সম্প্রচার করে যা পড়লে, দেখলে এবং শুনলে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন  শ্রেণীর মধ্যে শত্রতা, ঘৃণারভাব বাড়বে এবং এতে আইন শৃঙ্খলা অবনতি ঘটে, ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তা হলে এটি অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ জন্য অরাধীকে সর্বোচ্চ ৭ বছরে এবং সর্বনিম্ন ১ বছরের কারাদন্ড অথবা ৭ লাখ টাকা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মসজিদ ভাঙ্গা, মন্দিরে হামলা এবং ভাংচুর, সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে দাঙ্গা হাঙ্গমার ঘটনা এ দেশে ঘটেছে। একই সঙ্গে কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা ও ভাংচুড়ের ঘটনাও ঘটেছে একই কায়দায়। আগামী দিনে এ ধরণের কোন গুজব ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হলে তা শাস্তির আওতায় আনা হবে।

আইনটির ১৫ ধারায়  ডিজিটাল বা সাইবার সন্ত্রাসী কাজের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিমধ্যে আদালতের রায়ে মিমাংসিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিষয়াবলী এবং জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রপাগান্ডা, প্রচারণা বা মদম প্রচার করে তা হলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ জন্য অপরাধে সর্বোচ্চ জাবতজীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং সর্বনিম্ন ৩ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। আইনের ৪ ধরায় অতিরাষ্টিক প্রয়োগের পরিধি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি কেউ বাংলাদেশের বাইরে বসে এ আইনে অধীনে কোন অপরাধ করে যা বাংলাদেশে করলে দন্ডযোগ্য হতো তা হলে এই আইন এমন ভাবে প্রযোজ্য হবে যেন অপরাধটি তিনি বাংলাদেশেই করেছেন। দেশের বাইরে বসে দেশের  যে কোন স্থানে অবস্থিত কম্পিউটার, কম্পিউটার সিষ্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাযায্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এ আইনের অধীনে কোন অপরাধ করলে তা দেশের ভেতরে বসেই করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। বাংলাদেশের ভেতর থেকে দেশের বাহিরে কোন অপরাধ করলেও এই আইনের বিধানাবলীর আলোকে বিচার করা হবে। নতুন আইনটিতে শিশুর বয়স বিষয়ে বলা হয়েছে বিদ্যমান অন্য কোন আইনে যাই থাকুক না কেন এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণে সর্বোচ্চ ১৮ বছর পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে।

সামাজিক যোযোগ মাধ্যমের সংঘা দেওয়া হয়েছে আইনটিতে। এতে বলা হয়েছে, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে অফলাইন, অনলাইনে পারষ্পারিক যোগাযোগ, তথ্য উপাত্ত আদান প্রদান, চ্যাট, ভিডিওচ্যাট, ইমেইল, গ্রুপ, পৃষ্ঠা ও ব্লগ সাইট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে। আইনটিতে মানহানি প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে ১৮৬০ সালের ৪৫ নং আইনে ৪৯৯ ধারায় মানহানির যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা প্রযোজ্য হবে। আইনটিতে ডিজিটাল জালিয়াতির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি এক বা একাধিক ব্যক্তি বিনা অনুমতিতে অনধিকারে অধিকারের অতিরিক্ত হিসেবে, অনধিকার চর্চার মাধ্যমে কোন কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইসের ইনপুট, আউটপুট প্রস্তুত অথবা পরিবর্তন করা অথবা মুছে ফেলা, অথবা ধামাচাপা দেওয়ার মাধ্যমে অশুদ্ধ ডাটা অথবা অশুদ্ধ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভুল, ভ্রান্ত কাজ, কার্যক্রমে তথ্য সিষ্টেম, কম্পিউটার এবং কম্পিউটার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে তা হলে তা ডিজিটাল জালিয়াতি বলে বিবেচিত হবে।

আইনে ডিজিটাল পর্নোগ্রফি ও শিশু পর্নোগ্রাফি বিষয়ে আইনে রক্ষা কবচ রয়েছে। আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম,কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম, ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধমে ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি অথবা অশ্লীল উপাদান উৎপাদন ও প্রকাশ, সংরক্ষণ, অশ্লীল উপাদান বিতরণ বা প্রদর্শন, অশ্লীল উপাদানে প্রবেশ করলে তা পর্নোগ্রাফি অথবা শিশুপর্নোগ্রাফি  অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধীকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সর্বনিম্ন ১ বছরের কারাদন্ড অথবা ৫ লাখ টাকা অথবা উভয় দন্ডেদন্ডিত করা হবে। একই আইনের ক,খ,গ,ঘ ও ঙ ধারায় অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর সর্বনিম্ন ২ বছরের কারাদন্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডেদণ্ডিত করা হবে।

আইনটিতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত গোপণীয়তা প্রকাশ করা যাবে না। সেই ক্ষেত্রে ছবি তোলা, বিকৃত কিংবা ধারণ করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। সেই ক্ষেত্রে ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া, ইলেক্টনিক রেকর্ড, বই, রেজিস্টার, পত্র যোগাযোগ, তথ্য, দলিল কিংবা অন্য কোন বিষয়বস্তু অন্য কোন ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা যাবে না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ইলেক্টনিক উপায়ে নগ্ন বা অন্তর্বাস পরিহিত যৌনাঙ্গ, যৌনাঙ্গের আশপাশ, নিতম্ব, বা মহিলাদের স্তন, ব্যক্তির নজর এড়িয়ে তার অনাবৃত অংশ চিত্রবন্দী করা যাবে না। এছাড়া ইলেক্টনিক উপায়ে দৃশ্যমান ছবি প্রদর্শন কিংবা কারো নিকট প্রেরণ, দৃশ্য ধারণ অর্থাৎ ভিডিও টেপ, আলোকচিত্র, ফ্লিম বা রেকর্ড ধারণ করা যাবে না। এ ধরণের অপরাধের জন্য অপরাধীকে ২ বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ২ লাখ টাকা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এ আইনের অধীনে ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল থাকবে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী ওই কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্বপালন করবেন। আইনের অধীনে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি গঠিত হবে। সরকারের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ডিজিটাল নিরাত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। সাইবার অপরাধ পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, মোবাইল ভয়েস ও ডেটা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সংস্থার তৎপরতা বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ করবে।  সংস্থটি ডিজিটাল অপরাধ সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। সংস্থাটির অধীনে মহাপরিচালকের নিয়ন্ত্রণে একাধিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব থাকবে। এ ছাড়াও সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাব স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ সাইবার ইমারজেন্সী অথবা ইনসিডেন্ট রিসপন্স টিম নামে একটি বাংলাদেশ কার্ট থাকবে। যে কোন ধরণের সাইবার হামলা প্রতিরোধে এ কার্ট তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রতি মাসে এক বার বাংলাদেশ কার্ট সম্পর্কিত প্রতিবেদন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিবের কাছে পেশ করবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্ত সচিব জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলকে অবহিত করবেন।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !