দেশেও বিটকয়েন লেনদেন ॥ রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার প্রলোভন

ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না। শুধু হিসাব রাখা যায় ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনের। যিনি লেনদেন করছেন, গোপন থাকছে তার পরিচয়। তার বদলে ব্যবহার হয় সঙ্কেতলিপি। আর তাতেই পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডিজিটাল কারেন্সি বিটকয়েন। যদিও পৃথিবীর কোন দেশের স্বীকৃত বা বৈধ মুদ্রা নয় এই বিটকয়েন। বাংলাদেশেও এই মুদ্রা অবৈধ। কিন্তু তারপরও হচ্ছে লেনদেন। জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এ লেনদেনের প্রচার করছে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র। অর্থ লেনদেন করছে দেশে কার্যরত বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যম বিকাশ ও রকেট । যদিও ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে বিটকয়েন লেনদেন নিষিদ্ধ। তারপরও এই ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেন চলছে, আর এতে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা করছেন বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তিবিদরা। তারা বলছেন, সাবধান, লেনদেনে সতর্ক হতে হবে। ইতোমধ্যে কয়েক দফায় বিটকয়েন লেনদেন নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বলছে, এ ধরনের মুদ্রায় লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ। এই মুদ্রার লেনদেনে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, দেশে একসময় হঠাৎ করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ব্যবসা। এ ব্যবসা পদ্ধতি অবলম্বন করে ডেসটিনি, যুবক, ইউনিপেটুইউ, নিউওয়েসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের মুনাফার প্রলোভন দিয়ে আকৃষ্ট করে সাধারণ মানুষকে। হঠাৎ কোটিপতি বনে যান এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। এর পরের ঘটনাগুলো সবারই জানা। অনেকটা সেভাবেই বাংলাদেশে এসেছে ‘বিটকয়েন’। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুললেই চোখে পড়ছে বিটকয়েনের চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন। এতে বলা হচ্ছে, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার হাতছানি। হাজার টাকা ঢাললে এক বছরেই তা কয়েক কোটি! এসব বিজ্ঞাপনে গত বছরের শেষের দিকে ১ বিটকয়েনের দাম ছাড়িয়েছিল ২০ হাজার ডলার। অথচ এক বছরে এই মুদ্রার দাম বেড়েছে ১ হাজার ৫৫০ শতাংশ। রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার মতো অঙ্ক? আর হয়ত সেই কারণেই আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বিজ্ঞাপন ‘এখানে টাকা রাখুন’। অথচ এই মুদ্রার অনেক কিছুই এখনও স্পষ্ট নয়। ধোঁয়াশায় ভরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই ভার্চুয়াল মুদ্রা বা কয়েন কোন দেশের নয়। এর কোন নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক নেই। অনেকটা হাওয়ার ভিতে অট্টালিকার মতো। পশ্চিমা বিশ্বে অনলাইনে ডলার-পাউন্ড-ইউরোর পাশাপাশি কেনাকাটা করা যায় বিটকয়েনে। তবে অন্যান্য মুদ্রাব্যবস্থায় যেমন সে দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জড়িত থাকে, বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা নয়। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের কেউ কিংবা একদল সফটওয়্যার ডেভেলপার নতুন ধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’র প্রচলন করে। নাকামোতোর উদ্ভাবিত সেই ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম দেয়া হয় বিটকয়েন। ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতে বিটকয়েনের অবস্থান শীর্ষে থাকলেও এরইমধ্যে বাজারে এসেছে ইথেরিয়াম, বিটকয়েন ক্যাশ, রিপল, ড্যাশ, লাইটকয়েন, মোনেরো, জিক্যাশ, ড্যাশ প্রভৃতি নামের অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সি। বর্তমানে সারাবিশ্বে সর্বমোট ১ হাজার ৩৭৫টি ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে। পাশাপাশি পৃথিবীতে টাকা, ডলার, পাউন্ডের মতো ১৮০টি মুদ্রা চালু রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিটকয়েনে বিনিয়োগের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে। ডেনমার্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিটকয়েনকে এক ভয়াবহ জুয়া বলে সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপের দেশে দেশে এ মুদ্রা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এশিয়ায় এখনও অবৈধ এ মুদ্রার লেনদেন। এশিয়ায় বিটকয়েন অবৈধ রাশিয়া, ভারত, চীন, বাংলাদেশ, সুইডেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বেশকিছু দেশে। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এন্ডরু বেইলিও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা সরকার এ মুদ্রাকে অনুমোদন দেয়নি। তাই এর পেছনে বিনিয়োগ মোটেই নিরাপদ নয়।’ কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা আর্থিক সংস্থার কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এবং গ্রাহকের পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ থাকায় রয়েছে দরপতন এবং হ্যাকিংয়ের আশঙ্কা। তাই পশ্চিমা বিশ্বে বিটকয়েন কেনা সহজ হলেও এশিয়ায় এ ভার্চুয়াল মুদ্রা কিনতে হয় গোপনে।

খোঁজ নিয়ে বাংলাদেশে বিটকয়েন লেনদেনের অন্তত অর্ধশতাধিক ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্যাক্সফুল ডটকম নামে একটি ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে এরই মধ্যে ৪০ হাজার বিটকয়েন বিক্রি হয়েছে। ৫৫ হাজার ক্রেতা এই বিটকয়েন কিনেছেন। লোকাল বিটকয়েনস ডটকম নামে অন্য একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিং এবং সাধারণ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিটকয়েন কেনাবেচা করা যায়। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ওয়েবসাইট বিটকয়েন লেনদেনে টোকেন বিক্রি শুরু করেছে। ‘বিটকয়েন বাংলাদেশ’, বিটকয়েন ফোরাম বাংলাদেশ, ‘বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ : বিটকয়েন বাই এ্যান্ড সেল বাংলাদেশ’ নামে বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ খুঁজে পাওয়া যায়। এসব পেজেও বলা হয়েছে, বিকাশ, রকেটসহ মোবাইল ব্যাংকিং ও সাধারণ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিটকয়েন কেনাবেচা করা যাবে। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বিটকয়েন লেনদেন করাটা অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারণার শিকার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তারপরও কেউ যদি এই লেনদেনে খুব বেশি আগ্রহী হন তাহলে সটিক ওয়েবসাইট খুলে ডাউনলোড করতে হবে সফটওয়্যার। তারপর ওয়ালেট তৈরি করে সংগ্রহ করতে হবে বিটকয়েন।

জানা গেছে, বিট কয়েনের বৈধতা পেতে ২০১৪ সালে উদ্যোগ নেয় এদেশের আগ্রহী কিছু ফিল্যান্সার। এর অংশ হিসেবে ওই সময় তারা বেশকিছু ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর একটি সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিটকয়েন কোন দেশের ইস্যুকৃত বৈধ মুদ্রা নয়। বিটকয়েন বা বিটকয়েনের মতো কিংবা অন্য কোন কৃত্রিম মুদ্রায় লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ সরকারের কোন সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন বহির্ভূত এসব লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ বিজ্ঞপ্তির পর দেশে বিট কয়েন চালুর উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে বিটকয়েন নিষিদ্ধ হলেও বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠান এ ভার্চুয়াল মুদ্রায় পেমেন্ট নিয়ে থাকে। দেশে অবৈধ হলেও বিটকয়েনের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত তারেক জামান (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, বিটকয়েন ডলার কিংবা টাকায় রূপান্তর করা হচ্ছে। অনলাইনে যোগাযোগ করে যে কেউ তাদের কাছ থেকে বিটকয়েন বিনিময় করতে পারেন। এক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে কমিশন নেন তারা। আর বিক্রেতার কাছ থেকে নেয়া বিটকয়েন পরবর্তীতে অনলাইনেই বিদেশী মার্কেট প্লেসগুলোয় বিক্রি করা হয়। দেশে বিটকয়েনে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত এ ধরনের কয়েকটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া অনলাইনভিত্তিক একাধিক সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে তারা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মুখপাত্র ও অর্গানাইজ ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, বিটকয়েনের ব্যবহার দেশে পুরোপুরিই অবৈধ। তবে বেশ কয়েকটি চক্র বিটকয়েনের ব্যবসা করছে। এরই মধ্যে এমন একটি চক্রের সন্ধানও পাওয়া গেছে। কিন্তু এ লেনদেন ভার্চুয়ালি হয়ে থাকে। ফলে তাদের শনাক্ত করাটা একটু কঠিন। তাছাড়া অস্ত্র, মাদক, এমনকি সন্ত্রাসী অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বিটকয়েনের ব্যবহার ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মত দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিটকয়েন মূলত ইন্টারনেট সিস্টেমে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কে প্রোগ্রামিং করা আছে, যা চাইলে কেনা যায়। তবে এটি কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোন দেশের জারি করা মুদ্রা নয়। ইন্টারনেট সিস্টেমকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এই সিস্টেমকে ডেভেলপ করেছে। এটাকে এক ধরনের জুয়া খেলা বলা যেতে পারে। মনসুর বলেন, এই মুদ্রার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এর কোন কর্তৃপক্ষ নেই। এ কারণে এটা অবৈধ। তবে জুয়ারিদের কাছে এটা জনপ্রিয়। এক সময় এর দাম ছিল এক শ’ ডলার। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে হয় এক হাজার ডলার। এখন এর দাম ১৯ হাজার ডলারে উঠে গেছে। যে কারণে লোভে পড়ে অনেকেই এই মুদ্রায় বিনিয়োগ করছে। কিন্তু হঠাৎ করে এর পেছনের লোকেরা বাজার থেকে সরে গেলে বিপদে পড়বেন অনেকেই।

বিটকয়েন লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা জারি ॥ বিটকয়েন নিয়ে একাধিকবার সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের এ সংক্রান্ত একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে দেশে বিটকয়েনের লেনদেন হচ্ছে, যা কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত নয়। ফলে মানুষের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ ধরনের অবৈধ মুদ্রার লেনদেন না করতে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে আরও বলা হয়েছে, অনলাইনভিত্তিক ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপ্পেল ও লিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিনিময় প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হচ্ছে। এসব ভার্চুয়াল মুদ্রা কোন দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা বৈধ মুদ্রা নয়। ফলে এর বিপরীতে কোন আর্থিক দাবির স্বীকৃতিও নেই। ভার্চুয়াল এসব মুদ্রার লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত না হওয়ায় তা আইন দ্বারা সমর্থিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নামবিহীন বা ছদ্মনামে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এছাড়া অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনকারী গ্রাহকরা ভার্চুয়াল মুদ্রার সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন ঝুঁঁকির সম্মুখীন হতে পারেন। সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকি এড়াতে বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন বা এসব লেনদেনের প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।