/পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ে কুমিল্লাজুড়ে হতাশা *ফেল করেছে ৭৬ হাজার শিক্ষার্থী *শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবি পদ্ধতিগত কারণে এই বিপর্যয়

পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ে কুমিল্লাজুড়ে হতাশা *ফেল করেছে ৭৬ হাজার শিক্ষার্থী *শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবি পদ্ধতিগত কারণে এই বিপর্যয়

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে ফল বিপর্যয় ঘটেছে। প্রায় ৭৬ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ফেল করেছে। ফলাফলে সাফল্যের হার অনুযায়ী দশ বোর্ডের মধ্যে কুমিল্লার অবস্থান দশম। রাজশাহী বোর্ডে যেখানে পাসের হার ৯০ দশমিক ৭০, সেখানে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। কেন এমন হলো তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সকলেই এই ফলাফলে হতাশ। এর জন্য কি শুধু শিক্ষার্থীদের মেধাই দায়ী না অন্যকিছু? কুমিল্লার শিক্ষকদের দাবি, পদ্ধতিগত কারণেই এই ফল বিপর্যয় হয়েছে। বিশেষ করে অন্যান্য শিক্ষাবোর্ডের তুলনায় কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের প্রশ্ন ছিল কঠিন। উত্তরপত্র মূল্যায়নেও ত্রুটি ছিল বলে অভিযোগ তাদের।

এবার এই বোর্ড থেকে ১ লাখ ৮২ হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১ লাখ ৮ হাজার ১১১ জন। সবচেয়ে বেশি খারাপ করেছে মানবিকের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগে পাস করে মাত্র ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ। আর মানবিকে ছেলেদের পাসের হার ৩৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। ৬০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করেছে ইংরেজি ও গণিতে।

গত কয়েক বছরের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায় কুমিল্লার ফল বরাবরই ভালো ছিল। ২০১০ সালে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ০৩ শতাংশ, ২০১১ সালে পাসের হার ৮৫ দশমিক ৮৫, ২০১২ সালে ৮৫ দশমিক ৬৪, ২০১৩ সালে ৯০ দশমিক ৪১, ২০১৪ সালে ৮৯দশমিক ৯২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ , ২০১৬ সালে ৮৪ । এবার পাসের হার ৫৯ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসায় নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে।

শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এ ফল বিপর্যয় স্বাভাবিক, নাকি কোন পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে হয়েছে তার অনুসন্ধান করা। কেননা এই ফল কুমিল্লাবাসীকে হতবাক করেছে।

কুমিল্লা পুলিশ লাইন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তফাজ্জল হোসেন বলেন, শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র তৈরি এবং সৃজনশীল বিষয়ে জটিলতা নিয়ে শিক্ষকদের মতামত নেয় না। বোর্ড কর্তৃপক্ষ নিজের পছন্দের স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ এবং ইচ্ছেমতো প্রশ্ন প্রণয়ন করে থাকে। এছাড়া বোর্ড থেকে এ বছর মডেল উত্তরপত্র পরীক্ষকদের কাছে সরবরাহ করায় খাতা মূল্যায়নে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

কুমিল্লার শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রোকসানা ফেরদৌস মজুমদার বলেন, সৃজনশীলে কঠিন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সৃজনশীল বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের সংকট এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রশ্নপত্র বিষয়ে মেধা কম থাকায় ফলাফলে এমন বিপর্যয় ঘটেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর অপর একটি খ্যাতনামা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলেন, খাতা মূল্যায়নের জন্য বোর্ড থেকে উত্তরপত্রসহ নির্দেশিকা সরবরাহ করা হয়েছে। ওই উত্তরপত্র অনুসারে খাতা দেখার জন্য মৌখিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষকরা ভয়ে নম্বর কমিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে, যা হয়তো অন্য বোর্ডে এমন ছিল না। খাতা মূল্যায়নের নির্দেশিকা, প্রধান পরীক্ষক ও বোর্ড কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং মাঠ পর্যায়ে খাতা মূল্যায়নকারী সৃজনশীল বিষয়ে অদক্ষ পরীক্ষকের কারণে শিক্ষার্থীরা এ ধরণের ফলাফল করেছে।

শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করেন মজিবুর রহমান বাবলু নামে জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন, গণিত ও ইংরেজির সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংকট, প্রশ্নপত্র প্রণয়নে দূরদর্শিতার অভাব, খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মডেল উত্তরপত্র চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষকদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে নম্বর কম দিতে বাধ্য করায় ফলাফলে বিপর্যয় ঘটেছে।

এছাড়া বোর্ড শুধু পরীক্ষা নিয়ে সারা বছর ব্যস্ত থাকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাল পড়ালেখার বিষয় যতাযথভাবে মনিটরিং করা হয় না।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড মডেল কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জনকারী আরমান রহমান জানায়, পরীক্ষার আগ মুহুর্তে সৃজনশীলে নম্বর বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের জানানো হয়েছে। এছাড়া এ বছর বিগত বছরের মতো প্রশ্নপত্রের ধারাবাহিকতা ছিল না। এতে পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্র বুঝে উঠতেও সময় লেগেছে। বিশেষ করে কুমিল্লা বোর্ডে অন্য বোর্ডগুলোর তুলনায় ইংরেজি ও গণিতের প্রশ্নপত্রও এবার কঠিন হয়েছে।

তবে কুমিল্লা বোর্ডের ইংরেজির প্রধান পরীক্ষক আলতাফ উদ্দিন বলেন, আগে শিক্ষার্থীরা লিখলেই নম্বর পেত। এবার তা হয়নি। বোর্ড থেকে নির্দেশনা ছিল যাতে উদারভাবে খাতা না দেখা হয়। বোর্ডের নির্দেশনার আলোকেই খাতা দেখেছি। এই প্রধান পরীক্ষক আরো বলেন, অন্য পরীক্ষকরা খাতা মূল্যায়ন শেষে জমা দেয়ার পর নতুন করে আবার দেখেছি। নতুন করে মূল্যায়নে তারা পাস করেছে। নইলে পাসের হার আরো কমতো বলে দাবি করেন এই প্রধান পরীক্ষক।

তবে ভিন্নমত রয়েছে। ইংরেজি বিষয়ের অপর এক প্রধান পরীক্ষক গোলাম সারোয়ার ফেরদৌস বলেন, প্রশ্ন কঠিন হয়নি। এবার যে পরীক্ষার্থীরা স্কুলের নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করেছে তাদেরও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফেল করেছে। তিনি বলেন, কুমিল্লা বোর্ডের ফলকে বিপর্যয় বলা যাবে না। এটাই প্রকৃত চিত্র।

কুমিল্লার দাউদকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জসীম উদ্দিন এবার এসএসসির গণিত বিষয়ের খাতা মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, বোর্ড থেকে সরবরাহ করা মূল্যায়ন পত্র এবং কোথায় কত নম্বর দেওয়া যাবে তাও উল্লেখ ছিল। এ কারণে কেউ ইচ্ছে করলেই কমবেশি নম্বর দিতে পারেনি। এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে খুবই কঠোর ছিল পরিদর্শকরা। শিক্ষার্থীরা যা পেরেছে তা-ই লিখেছে। পরীক্ষার হলের কঠোরতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি কাজ করেছে। এ কারণেই ফল খারাপ হয়েছে বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল খালেক বলেন, স্কুলগুলো কেন এত খারাপ করলো সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। কারণ অনুসন্ধান করছি। তবে খারাপ করার প্রধান কারণ ইংরেজি ও গণিত। গ্রামের স্কুলগুলোতে ভালো মানের শিক্ষক নেই। সঠিক প্রক্রিয়ায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !