/প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক সংকট আর কতদিন?

প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক সংকট আর কতদিন?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক সংকট দীর্ঘকালের। আশঙ্কার কথা হইল, এই সংকট সহসা মিটিতেছে না। দেশের ৩২ শতাংশ বিদ্যালয় চলিতেছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এই শূন্যপদের সংখ্যা সম্প্রতি ২০ হাজার ৫১৬টিতে উন্নীত হইয়াছে। অবসরে যাইবার কারণে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে প্রতিদিনই। এইদিকে প্রধান শিক্ষকের পদ দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হইবার কারণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হাতে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের এখতিয়ার নাই। এখন এই পদে নিয়োগের দায়িত্বে রহিয়াছে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, মামলার কারণে পদোন্নতির মাধ্যমেও শূন্যপদ পূরণ করা সম্ভব হইতেছে না। গত বত্সরের আগস্টে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে নিয়োগের জন্য ৩৪তম বিসিএস হইতে ৮৯৮ জনকে সুপারিশ করিয়াছিল পিএসসি। কিন্তু এখনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করিতে পারে নাই।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কোর) তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতি ৪৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক শিক্ষার মান অর্জনে এই নিয়ম অনুসরণ হইতেছে বিশ্বব্যাপী। অথচ, আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই অনুপাত অনুসরণ করা সম্ভব হইতেছে না। এই ক্ষেত্রে প্রকৃত চিত্র অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ই চলিতেছে চারজন শিক্ষক দ্বারা। ইহার মধ্যে একজন আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তাহাকে প্রায় প্রতিদিনই উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনারে অংশগ্রহণসহ নানা প্রশাসনিক কাজ করিতে হয়। এমনিতেই ৩০ সহস্রাধিক সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি রহিয়াছে। ফলে আরো প্রায় ২১ হাজার প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে যদি ২১ হাজার সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন, তাহা হইলে সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি বাস্তবিক অর্থে উন্নীত হইতেছে ৫১ হাজারে। আবার শিক্ষকদের ৬০ শতাংশ নারী ইহবার কারণে মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানাভাবে  গড়ে একজন ছুটিতে থাকেন। ফলে বহু ক্ষেত্রেই বাকি একজনকেই চালাইতে হয় পুরো বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। একদিকে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের ঘাটতি, অন্যদিকে যোগ্যতাসমপন্ন শিক্ষকের অভাব—সব মিলাইয়া শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভবপর হইতেছে না। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর হইতে জানা যায়, পদোন্নতিসংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে শূন্য আসনের ৩৫ শতাংশ নিয়োগের বিধান রহিয়াছে। বাকি ৬৫ শতাংশ শূন্যপদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করিতে হইবে। শূন্যপদের সরাসরি ৩৫ শতাংশ অর্থাত্ সাত হাজার পদ পূরণ করিতে হইবে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য জানাইয়াছেন, ৬৫ শতাংশ নিয়োগ পদোন্নতির মাধ্যমে দেওয়ার জন্য একটি তালিকাও তৈরি হইয়াছিল। কিন্তু নূতন জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের একটি অংশ এই তালিকার বিরুদ্ধে রিট করিলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হইয়া যায়। ফলে সহসা শূন্যপদ পূরণেরও সুযোগ নাই।
মামলা বা নিয়োগের জটিলতা কিংবা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সমস্যা—এই ধরনের নানাবিধ কারণ উঠিয়া আসিতেছে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ সংক্রান্ত জটিলতার ক্ষেত্রে। সমস্যা আমলাতান্ত্রিক কিংবা মামলা জটিলতা—যাহাই হউক না কেন, প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ডকে শক্ত করিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। সুতরাং প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করিতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় প্রদান করিতে হইবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !