বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে কন্যা হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্ম হয়েছিল দাদাবাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। তার জন্মের সময় পাশে থাকতে পারেননি বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন কলকাতায়। দেশভাগের সূত্র ধরে ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পাশে থেকে ভূমিকা পালন করছিলেন। পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কলকাতার পাট চুকিয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসার। যার জন্য এ সময় তিনি একাধিকবার কলকাতা-ঢাকায় আসা-যাওয়া করলেও টুঙ্গিপাড়ায় যেতে পারেননি। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কলকাতায় বসেই প্রথম সন্তানের জন্মের খবর পান জাতির জনক শেখ মুজিব।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বই থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ বই দুটিতে শেখ হাসিনার জন্মের কথা না থাকলেও রয়েছে তার বেড়ে ওঠার টুকরো টুকরো স্মৃতি। রয়েছে শেখ হাসিনার পড়াশোনা ও বিয়ের তথ্যও। এর কোনোটি বঙ্গবন্ধু লিখেছেন কারাগারে বসে, আবার কোনোটি রাজনৈতিক কারণে ঢাকা বা অন্য কোথাও থাকার সময়।

বঙ্গবন্ধু তার বইয়ে শেখ হাসিনাকে কখনও ‘হাচিনা’ আবার কখনো ‘হাচু’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি আজীবন ওই নাম দুটোতেই ডাকতেন। অবশ্য গোপালগঞ্জ-খুলনা অঞ্চলের মানুষ হাসিনা উচ্চারণ ‘হাচিনা’ও করে থাকেন।

বঙ্গবন্ধুর পরিবার (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)বঙ্গবন্ধুর পরিবার (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

শেখ হাসিনার জন্মের সময় বঙ্গবন্ধু কোথায় ছিলেন, তা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে উল্লেখ নেই। এটি উল্লেখ আছে শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে। ওই বইয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমার বাবা শেখ ‍মুজিবুর রহমান রাজনীতি করতেন। বেশির ভাগ সময় তাঁকে তখন জেলে আটকে রাখা হতো। আমি ও আমার ছোট ভাই কামাল মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদির কাছে থাকতাম। আমার জন্মের সময় বাবা কলকাতায় পড়তেন, রাজনীতি করতেন। খবর পেয়েও দেখতে আসেন বেশ পরে।’ সাংবাদিক, কলামিস্ট মরহুম বেবী মওদুদও তার একটি লেখায় এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে প্রথম শেখ হাসিনার কথা লেখা হয়, যখন তিনি একটু একটু হাঁটতে শিখেছেন। ঘটনার বর্ণনা বঙ্গবন্ধু করেছেন জেলে থাকা অবস্থায়। এটি ছিল ভারত ভাগের পর তার দ্বিতীয় দফা কারাভোগের সময়। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে তিনি মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের ১১৮ পৃষ্ঠায় ওই সময়কালে স্মৃতিচারণে প্রথম শেখ হাসিনার বিষয়ে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি লিখেছেন, ‘রেণু (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) তখন হাচিনাকে নিয়ে বাড়িতেই থাকেন। হাচিনা তখন একটু হাঁটতে শিখছে।’

এছাড়া বইটির আরও অন্তত ১০টি পৃষ্ঠায় একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ এসেছে। এই বইয়ের বর্ণনাকালীন সময়ে শেখ হাসিনার শৈশব চলে। বইটির ১৪৬ পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনা সম্পর্কে বর্ণনা এভাবে এসেছে—‘মন চলে গেছে বাড়িতে। কয়েকমাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভালো করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলেমেয়ের পিতা হয়েছি।’

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের ১৬৫ পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে, দিনের বেলায় রওনা হলে শেখ হাসিনা কাঁদবেন বলে বঙ্গবন্ধু রাতে রওনা দিয়েছেন।

কিশোরী শেখ হাসিনা (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)কিশোরী শেখ হাসিনা (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

১৮৩ পৃষ্ঠায় গোপালগঞ্জে মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে শেখ হাসিনাসহ সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা লিখেছেন। এখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘গোপালগঞ্জ গিয়ে দেখি থানার ঘাটে আমাদের নৌকা। আব্বা মা, রেণু, হাচিনা ও কামালকে নিয়ে হাজির। ঘাটেই দেখা হয়ে গেল।… এক বৎসর পরে ওদের সাথে দেখা। হাচিনা গলা ধরলো, আর ছাড়তে চায় না। কামাল আমার দিকে চেয়ে আছে, আমাকে চেনেও না আর বুঝতেও পারে না, আমি কে। মা কাঁদতে লাগলো।’

১৯১ পৃষ্ঠায় লেখা আছে জেল থেকে গোপালগঞ্জ হাজিরা দিতে গেছেন, তখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়। বঙ্গবন্ধুর শরীর কিছুটা ভেঙে পড়ায় তাঁকে দেখে স্ত্রী রেণু কান্নাকাটি শুরু করেন। তা দেখে শেখ হাসিনা ও শেখ কামাল ছুটে গিয়ে মায়ের গলা ধরে আদর করতে লাগলেন।

শেখ হাসিনা, তার দুই সন্তান ও শেখ রাসেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্ত্রী (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)শেখ হাসিনা, তার দুই সন্তান ও শেখ রাসেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্ত্রী (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

বইয়ের ২০৫ থেকে ২১০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত কয়েকবারই শেখ হাসিনার কথা বর্ণনা করেছেন পিতা শেখ মুজিব। ‍ওই সময় বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে আনা হয়েছিল। জেলখানায় তিনি অনশন করেছিলেন। এতে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। মারা যেতে পারেন নিজেই, এমন আশঙ্কা করছিলেন। তখন ভাবছিলেন পরিবার-পরিজনের কথা। মনে পড়ছিল দুই সন্তানের কথা। এখানে তিনি লিখেছেন, ‘বারবার আব্বা, মা, ভাইবোনদের চেহারা ভেসে আসছিল আমার চোখের সামনে। রেণুর দশা কী হবে? তার তো কেউ নাই দুনিয়ায়। ছোট ছেলেমেয়ে দুইটার অবস্থাই বা কী হবে? তবে, আমার আব্বা ও ছোট ভাই ওদের ফেলবে না, এ বিশ্বাস আমার ছিল। চিন্তাশক্তিও হারিয়ে ফেললাম। হাচিনা, কামালকে একবার দেখতেও পারলাম না। বাড়ির কেউ খবর পায় নাই। পেলে নিশ্চয়ই আসত।’

এ সময় বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর জেলে থাকলেও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দেখতে ঢাকা গিয়েছিলেন। ফরিদপুর আনার খবর পেয়ে অন্যদের ঢাকায় রেখে বঙ্গবন্ধুর বাবা ফরিদপুর চলে আসেন। অনশন না ভাঙার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থানের কারণে পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি বাবার কাছেই জানতে পারেন সবার ঢাকায় যাওয়ার খবর। মুক্তি পাওয়ার পর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি হয়ে পাঁচদিন পর বঙ্গবন্ধু গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন। তার আগেই স্ত্রী-সন্তানরা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে শেখ হাসিনা গলা জড়িয়ে ধরে ভাষা আন্দোলনের স্লোগান বলতে শুরু করেন। এখানে বঙ্গবন্ধু এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বললো—আব্বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই।’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় থাকার কারণে শেখ হাসিনা ওই স্লোগান সেখান থেকে শুনেছিল বলে বঙ্গবন্ধু তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন। প্রসঙ্গত, এ সময় শেখ হাসিনার বয়স ছিল প্রায় সাড়ে চার বছর।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের ২০৯ পৃষ্ঠায় শেখ কামাল সম্পর্কে একটি হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা রয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার নানা লেখায় ও বক্তব্যে তুলে এনেছেন। এখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছনায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাসিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি?’ আমি আর রেণু দু’জনেই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম আমি তো তোমারও আব্বা। কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল।” ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া শেখ কামালের বয়স সেই সময় আড়াই বছরের মতো ছিল।

একই বইয়ের ২১০ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু দুই সন্তানের ওপর মায়া বেড়ে যাওয়ার ভাব প্রকাশ করেছেন। এখানে তিনি লিখেছেন, ‘হাচিনা ও কামাল আমাকে ছাড়তে চায় না। ওদের উপর দুর্বলতা বেড়ে গেছে। রওনা হওয়ার সময় দুই ভাইবোন খুব কাঁদলো।’ ওই সময় বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকা ফিরছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

বইয়ের ২৮৫ পৃষ্ঠায় সর্বশেষ শেখ হাসিনার কথা বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধু। ওই সময় শ্বশুরের অসুস্থতার টেলিগ্রাম পেয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সন্তানদের নিয়ে স্টিমারে ঢাকার বাদামতলী থেকে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে রওনা করেন। যাওয়ার পথে বঙ্গবন্ধুর জন্য টেলিগ্রামের কপি যুক্ত করে তাঁর মুক্তির জন্য একটি আবেদন করে যান। এতে ওইদিনই বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হয়। তিনিও মুক্তি পেয়ে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে ওই একই স্টিমারে ওঠেন। তাকে দেখে স্ত্রী অবাক হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু আসায় তার স্ত্রী ঘুমন্ত বাচ্চাদের ডেকে তোলেন। এ সময় তারা জেগেই স্বভাবসুলভভাবে বাবার গলা জড়িয়ে ধরেন। বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর বর্ণনায় উঠে এসেছে এভাবে, ‘হাচিনা ও কামাল আমার গলা ধরল, অনেক সময় পর্যন্ত ছাড়ল না, ঘুমালও না, মনে হচ্ছিল এদের চোখে আজ আর ঘুম নেই।’

বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়েও বেশ কয়েকবার শেখ হাসিনার কথা উঠে এসেছে। এখানে বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে শেখ হাসিনার ভাইবোনদের কোলে নেওয়াসহ তাদের লালনপালনের কথা উঠে এসেছে। উঠে এসেছে শেখ হাসিনার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা ও বিয়ের কথাও। এখানে বলা হয়েছে, জেলে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে গেলে শেখ রাসেলকে সমসময় শেখ হাসিনার কোলেই দেখা যেত।

বইয়ের ১৯৪ পৃষ্ঠায় জেলগেটের আলাপচারিতায় ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের প্রস্তাবের কথা রয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনা ডিগ্রি পাস না করে বিয়ে করতে চান না বলে বাবার কাছে আবদার করেছেন উল্লেখ রয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু মেয়েকে তার মায়ের কথামতো চলতে বলেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায়ই ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার (সুধা) সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়।

এছাড়া বইটির ২৪০ ও ২৪৬ পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনার এইচএসসি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ না পাওয়ার আশঙ্কার কথা জানান তার বাবাকে। তবে দ্বিতীয় বিভাগ পাবেন এমন আশা প্রকাশ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু বাকি থাকা পরীক্ষাগুলোর জন্য ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনাও দেন। শেখ হাসিনা পরীক্ষা ভালোই দিয়েছেন বলেও বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে বর্ণনা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap