বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্র্রিয়া দেবী আর নেই

সংস্কৃতি ডেস্ক ॥ পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী আর নেই। কলকাতার বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের বাড়িতে শুক্রবার সকাল সাড়ে ছ’টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। শুক্রবার ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পর সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এরপর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসক।

এদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের দিকপাল অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগত। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুপ্রিয়া দেবীর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রের আর এক অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। সুপ্রিয়া দেবীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে যান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ সময় তিনি বলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। শেষ হলো উত্তম অধ্যায়েরও। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, দীর্ঘদিনের বন্ধুকে হারালাম, অনেক চলচ্চিত্রে এক সঙ্গে কাজ করেছি। এখন আমি কথা বলার অবস্থায় নেই।

তৎকালীন বর্মায় ১৯৩৩ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সুপ্রিয়া দেবী। তার বাবা পেশায় আইনজীবী ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্মা থেকে কলকাতা চলে আসে সুপ্রিয়া দেবীর পরিবার। মাত্র সাত বছর বয়সে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন তিনি। তার বাবার নির্দেশনায় দুটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ছোট থেকে নাচ খুব ভালবাসতেন অভিনেত্রী। কলকাতায় আসার পরও নাচ চালিয়ে যান তিনি।

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারকে ঘিরে যে নায়িকাবৃত্ত, তার প্রথম দুই নাম অবশ্যই সুচিত্রা সেন এবং সুপ্রিয়া দেবী। প্রায় পাশাপাশি মাধবী মুখোপাধ্যায় এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের নামও উচ্চারিত হতে পারে। তবে এদের মধ্যে সুপ্রিয়াই নায়ক উত্তমের পাশাপাশি একান্ত আপন করে পেয়েছিলেন ব্যক্তি উত্তমকে। উত্তম-সুপ্রিয়ার সম্পর্ক একটা সময় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের হট টপিক ছিল। উত্তমের মৃত্যু সম্ভবত তার মতো করে আর কাউকে নিঃসঙ্গ করেনি। তারপর প্রায় ৩৮ বছর ধরে তিনি যেভাবেই থাকুন, উত্তমের স্মৃতি জড়িয়ে ছিল সব সময়। কথায়-বার্তায়, আলাপ-আলোচনায় বারবার তার মুখে ফিরে ফিরে আসত ‘তোমাদের দাদা’র কথা।

উত্তমকুমারের বিপরীতে ১৯৫২ সালে ‘বসু পরিবার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে পথ চলা শুরু করেন সুপ্রিয়া। ১৯৫৯ সালে উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘সোনার হরিণ’ চলচ্চিত্র তাকে জনপ্রিয়তা দেয়। তারপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে ১৯৬০ সালে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সুপ্রিয়াকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ১৯৫৪ সালে বিশ্বনাথ চৌধুরীকে বিয়ে করেন অভিনেত্রী। সোমা নামে তাদের কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে বিশ্বনাথের সঙ্গে দাম্পত্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি সুপ্রিয়ার। ২০১১ সালে বঙ্গবিভূষণ এবং ২০১৪ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করা হয় তাকে।

‘সোনার হরিণ’, ‘শুন বরনারী’, ‘উত্তরায়ন’, ‘সূর্যশিখা’, ‘সবরমতী’, ‘মন নিয়ে’র মতো অসংখ্য চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের বিপরীতে তাকে মুখ্য ভূমিকায় দেখা গেছে। ছয়ের দশকের শেষের দিক থেকে পরবর্তী এক দশকে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের নায়িকার ভূমিকায় ছিলেন তিনি। তবে তার অভিনয় দক্ষতার সবচেয়ে আলোচিত দুই চলচ্চিত্র ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এবং ‘কোমল গান্ধার’।

এদিকে শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা পর্যন্ত রবীন্দ্র সদনে অভিনেত্রীর মরদেহ ছিল। সেখানে সাধারণ মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানান। তারপর কেওড়াতলায় গান স্যালুটের মাধ্যমে সুপ্রিয়া দেবীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে।