/বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুরু: ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নেওয়া হচ্ছে এক ক্যাম্পে

বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শুরু: ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নেওয়া হচ্ছে এক ক্যাম্পে

মিয়ানমারে অব্যাহত নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আঙ্গুলের ছাপ গণনা বা বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আনার কাজ শুরু হয়েছে৷ সোমবার বিকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিবন্ধনের কাজ শুরু হয়। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) খালেদ মাহমুদ রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজ শুরুর তথ্য বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যর্পন ও তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, আজ সোমবার নিবন্ধন প্রক্রিয়ার শুরুর কথা থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সকালে তাতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তখন আগামীকাল মঙ্গলবার এ কাজ শুরুর কথা বলা হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় সোমবার বিকালে এর কাজ শুরু হয়।

এডিএম খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সকালে কাজ শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয়েছে বিকেলে।’ এই কাজে সহায়তার জন্য ঢাকা থেকে কক্সবাজারে একটি টিম এসেছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাইন উদ্দিন জানিয়েছেন, কুতুপালং ক্যাম্প থেকেই রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজ শুরু করা হয়েছে। এখানে কুতুপালং ও বালুখালীতে দুটি টিম এবিষয়ে কাজ করছে।

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, ছবি- পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক থেকে নেওয়াতিনি আরও জানান,সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন করে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা হবে তাদের সবাইকে বালুখালীতে নতুন করে শরণার্থী শিবির তৈরি করে সেখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এছাড়াও যেসব রোহিঙ্গা ইতোপূর্বে বাংলাদেশে ঢুকে কক্সবাজারসহ অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে তাদেরও খুঁজে বের করে এই নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের বালুখালী ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা হবে।

বায়োমেট্রিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া কিভাবে করা হচ্ছে জানতে চাইলে এডিএম খালেদ মাহমুদ বলেন,প্রত্যেক রোহিঙ্গার নাম, ঠিকানা,আঙ্গুলের ছাপ ও ছবিসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ কাজে পাসপোর্ট অধিদফতরের একটি টেকনিক্যাল টিম সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে।নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, এর আগে বাংলাদেশে এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গারাসহ নতুনকরে আগতদের বালুখালী ক্যাম্পে নিয়ে আসা হচ্ছে। বালুখালীতে অনেক রোহিঙ্গা থাকতে পারবে। সে লক্ষ্যে রবিবার (১০ সেপ্টেম্বর)থেকে তাদের থাকার জন্য শেড নির্মাণ শুরু হয়ে গেছে। এখানে তাদের থাকার জন্য নতুন করে দেড় হাজার একর জায়গায় ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে আসা সব রোহিঙ্গা শরণার্থী এখানে থাকতে পারবেন।এজন্য আগের অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর লোকজনকেও বালুখালীতে আনা হবে বলে জানান তিনি।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা (ছবি: ফোকাস বাংলা)কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়ায় নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প রয়েছে দুটি। আর বাংলাদেশ সরকারের গণনা অনুযায়ী মোট ৩২ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা এদেশে রয়েছেন। এর মধ্যে উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন ১৪ হাজার রোহিঙ্গা। আর টেকনাফের নয়াপাড়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন ১৮ হাজার রোহিঙ্গা। এর বাইরে অনিবন্ধিত আরও ৫টি পুরনো শরণার্থী শিবির রয়েছে ওই এলাকায় যেখানে আনুমানিক দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাস করছেন।এসব অনিবন্ধিত ক্যাম্প রয়েছে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী এবং টেকনাফ উপজেলার লোদা, নয়াপাড়া ও শাপলাপুরে। তবে এর বাইরে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য জানতে সম্প্রতি রোহিঙ্গা শুমারি করা হয়। সেই শুমারির তথ্যানুযায়ী দেশে চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আর মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করায় চলতি সপ্তাহেই নতুন করে গড়ে উঠেছে অনিবন্ধিত আরও ৭টি শরণার্থী শিবির। এর মধ্যে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৪টি নতুন শরণার্থী শিবির। এগুলো হচ্ছে বালুখালী ঢালার মুখ শরণার্থী শিবির, তাজনিরমারছড়া শরণার্থী শিবির, শফিউল্লাহ কাটা শরণার্থী শিবির ও হাকিমপাড়া শরণার্থী শিবির।এছাড়াও টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে আরও তিনটি শরণার্থী শিবির। এগুলো পুটিবনিয়া, রইক্ষ্যং ও নাইক্ষ্যংছড়ি বাঁশবাগান এলাকায়। অনিবন্ধিত এসব শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পর নিয়ে যাওয়া হবে বালুখালীর নতুন শরণার্থী শিবিরে।

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পাশাপাশি তাদের বসবাসের জন্য যে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে সে প্রসঙ্গে উখিয়ার ইউএনও মো. মাইন উদ্দিন জানান,‘আমরা যে জায়গা নির্ধারণ করেছি এটা দুই হাজার একর।এই দুই হাজার একর জায়গার মধ্যে বালুখালী ও কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প (শিবির) দু’টোই পড়ে। মূলত এ দু’টো ক্যাম্পের মাঝখানে যে খালি জায়গাটা আছে তাতে রয়েছে ছয়শ’ একর জমি। আমরা আরও এক্সটেনশন করে নতুন যারা এসেছে তাদের জায়গা দেওয়ার জন্য দুই হাজার একর জায়গার প্রস্তাব করেছি। এর মধ্যে বালুখালী ও কুতুপালং দুটো শরণার্থী শিবিরই আছে।’

বালুখালীর শরণার্থী শিবির নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, ‘আমরা গতকাল পর্যন্ত দুইশ’ শেড নির্মাণ করেছি। এরইমধ্যে প্রায় ১৬শ’ পরিবারকে এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দ্রুতগতিতে এ কাজ এগিয়ে চলছে।’

বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে সবার ফিঙ্গার প্রিন্ট ছবি ও নাম ঠিকানা সংগ্রহ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কতোদিনের মধ্যে এই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে তা সেভাবে বলা যাবে না। এটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করবে। ইলেকট্রিসিটির ওপর নির্ভর করবে, লোকজন কতোটুকু সচেতন, তারা কতো দ্রুত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে সেটার ওপর ও নির্ভর করছে।

তবে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ায় তাদের খুঁজে বের করে এক জায়গায় আনাটা খুব কষ্টসাধ্য বিষয় উল্লেখ করে এডিএম খালেদ মাহমুদ বলেন,‘তাদের এক জায়গায় আনার জন্য কয়েকদিন যাবত চেষ্টা করছি আমরা। এটা খুব কষ্টসাধ্য বিষয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি। তাদের জন্য এক জায়গায় শেল্টার করে দিচ্ছি, এক জায়গাতেই টয়লেট করে দিচ্ছি, এক জায়গাতেই সবকিছু করে দিচ্ছি। যাতে করে সবাই এক জায়গায় চলে আসে।’

রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ হতে কতোদিন লাগতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে যাওয়ায় তাদের এক জায়গায় ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন কাজ৷ তাই বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কাজ কবে শেষ হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

নিবন্ধন করার কাজের সুবিধার জন্য সবাইকে একসঙ্গে আনার জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘অধিকাংশই এখানে আছে। আশেপাশে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও কিছু আছে। তারা এখানে চলে আসবে।’

আর বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের কারণে রোহিঙ্গারা যেসব সুবিধা পাবে সেগুলো জানতে পারলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গারাও এখানে চলে আসবে বলে আশাবাদী উখিয়ার ইউএনও মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন,‘তারা তো অসহায় মানুষ। তাদের কিছু সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন আছে। তাদের বসতি বসবাসের যোগ্য হতে হবে, যখন আমরা তাদের সে সুবিধাটা দিতে পারবো তখন আশেপাশে যারা আছে তারা এখানে চলে আসবে। আর এমনিতে যখন এখানকার কাজটা শুরু হবে, তখন যারা সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে, তাদের ব্যাপারে তথ্য নিশ্চয় চলে আসবে আমাদের কাছে।’

রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কেন প্রয়োজন জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে রোহিঙ্গা সেলের ফোকাল পয়েন্ট (মুখপাত্র) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (রাজনৈতিক-১) আবু হেনা মোস্তফা জামান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যর্পনের (রিপেট্রিয়েশন) সময় এই বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্ড তাদের কাজে লাগবে। কোনও কারণে রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে যদি মিয়ানমার আপত্তি তোলে সেক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে। আর রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কখনোই যেন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বেঁকে বসতে না পারে এ জন্যই এটি করা হচ্ছে। এছাড়াও যেহেতু প্রযুক্তি এগিয়েছে অনেকদূর আমরা সেটিকে কাজে লাগাচ্ছি। আর সাধারণভাবে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন করা হচ্ছে ও তাদেরকে পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে।যেহেতু বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করতে গেলে একজন মানুষের শরীরের অনেক কিছুরই প্রমাণ রাখতে হয়, সেহেতু এ পদ্ধতিতে রোহিঙ্গারা নিবন্ধিত হলে সেটি পাকাপোক্ত হবে।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !