বিএনপি খুনীদের দল : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে খুনীদের দল আখ্যায়িত করে বলেছেন, হত্যা, খুন এবং ষড়যন্ত্রের মধ্যদিয়েই দলটির জন্ম হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন। আর যাদের নিয়ে তিনি দল গড়েছেন তারাও খুনের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। কাজেই এটা নিয়ে আর সাফাই গাইবার কিছু নেই।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর এবং দক্ষিণ শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতির পিতার ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পত্র-পত্রিকা বা বিভিন্ন টক শোতে দেখি বিএনপি নেতারা সাফাই গাইতে গিয়ে একটা কথা খুব বেশি বলাবলি করছেন তা হলো-‘৭৫ সালেতো বিএনপি প্রতিষ্ঠাই হয়নি। তাহলে তারা আবার খুন করলো কিভাবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, এই দলের (বিএনপি) সৃষ্টিকারীই খুনী, আর খুনীদের নিয়েই তিনি দলটি করেন। তারা খুনের সঙ্গে যে জড়িত, এটার আবার সাফাই গাওয়ারতো কিছু নেই।
জিয়াউর রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি’র যে প্রতিষ্ঠাতা সে নিজেই তো খুনী। আর শুধু খুনীই নন, এই খুনিদের বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স যেমন জারি করেছিল তেমনি এই খুনীদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃতও করেছিল। যদিও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী অনেক দেশ এই খুনীদের চাকরি দেয়া মেনে নেয়নি।
তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ সভায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কুইন্স কাউন্সিলের সদস্য স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসি এমপি এর প্রধান ছিলেন। সেই সাথে আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নোবেল বিজয়ী শ্যান ম্যকব্রাইটও সেই কমিটিতে ছিলেন। একজন সলিসিটরও নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান সরকার তাঁদের বাংলাদেশে আসার ভিসা দেয়নি। অথচ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় এই টমাস উইলিয়াম কিউসি বাংলাদেশে এসেছিলেন পাকিস্তান সরকারের ভিসায়। কিন্ত জাতির পিতা হত্যার পর বাংলাদেশে তারা ভিসা পেলেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের আমি জিজ্ঞাসা করি- জিয়া যদি খুনী না হন আর তার হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এই বিএনপি যদি খুনীদের দল না হয় তাহলে স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসিকে কেন বাংলাদেশে তদন্ত করতে আসতে দেয়া হয়নি? কার দুর্বলতা কি ছিল?’
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহ এমপি এত সভাপতিত্ব করেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান এমপি, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সহ-সভাপতি জাহানারা বেগম, দক্ষিণের সহ-সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফি, উত্তরের যুগ্ম সম্পাদক এসএম মান্নান কচি, দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক কামাল চৌধুরী অন্যান্যের মধ্যে সভায় বক্তৃতা করেন।

’৭৫ এ জাতির পিতাকে হত্যার পর বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বে একটি খুনী জাতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিলিটারি ডিকটেটররা যখন ক্ষমতা নেন তখন তাদের মনে ভেতর একটি সুপ্ত বাসনা থাকে রাজনৈতিক নেতা হওয়ার। যদিও প্রথমে তারা রাজনৈতিক নেতাদেরই গালি দেন। পরে আবার উর্দ্দি খুলে রাজনীতিবিদ সাজতে চান।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘প্রথমে হ্যাঁ,না ভোট, তারপরে রাষ্ট্রপতির ভোট, অনেক নাটক করে এরপরে সে রাজনৈতিক দল করলো এবং সেটাও কয়েক দফা দলের নাম পরিবর্তন করে জিয়াউর রহমান বিএনপি সৃষ্টি করেন।’
তিনি বলেন, সেই দলে যোগ দিল আওয়ামী লীগের কয়েকটা বেঈমান-মোনাফেক, আর দলের অন্য সকল নেতা-কর্মীদেরই গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁরা কারাগারে ছিল। আবার ৩ নভেম্বর কারাগারে হত্যা করা হল জাতীয় চার নেতাকে। ’৭৫ সাল থেকে ’৭৯ সাল পর্যন্ত দলের নেতা-কর্মীরা কারাগারে বন্দি ছিল।
জিয়াউর রহমানই এদেশে গুম, খুনের রাজনীতির গোড়াপত্তনকারী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন- ‘৭৫ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীর ওপর তারা অকথ্য অত্যাচার করেছে। অনেককে যে ধরে নিয়ে গেছে পরিবার লাশটিও পায়নি। আজ তারা গুম খুনের কথা বলে। এই দেশে গুম-খুনের কালচারটা শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান।’
তিনি সে সময় গুমের শিকার কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের নারায়ণগঞ্জের ছাত্রনেতা মাহফুজ বাবুল, চট্টগ্রামে মৌলভী সৈয়দ, বগুড়ার যুবলীগ নেতা পটলকেও ধরে নিয়ে গিয়ে এমনভাবে খুন করে যে, পরিবার তাদের কোন হদিস পায়নি।’
শুধু আওয়ামী লীগ নয়, তথাকথিত ক্যু’য়ের নামে সেনা ও বিমান বাহিনীর হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে জিয়াউর রহমানকে অভিযুক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে জানতোনা তাদের কি অপরাধ এমনকি আত্মপক্ষ সমর্থনেরও কোন সুযোগ ছিল না। ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে এসেছে এমন অনেককেও মেরে ফেলা হয়।’
তিনি বলেন, ‘দিনের পর দিন ফাঁসি দিয়ে যেমন মেরেছে, গুলি করেও মেরেছে।’
তিনি বলেন ‘শোনা যায় জিয়াউর রহমান সকালে নাস্তার টেবিলে কাঁটাচামচ দিয়েই খেত। আর এ ধরনের মৃত্যুদন্ডের ফাইলে সই করতো’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক অনেকেই সশ¯্র বাহিনীর জওয়ানদের ফাঁসি কার্যকরের সময়কার চিৎকারের আওয়াজ পেত, আকাশ-বাতাসও সে সময় ভারি হয়ে উঠতো।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি’র চরিত্রটাই এ ধরনের খুনের। যেটা আপনারা দেখতে পেয়েছেন ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলায়। প্রকাশ্য দিবালোকে হামলা করে আইভি রহমানসহ আমাদের ২২ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হল।’
২১ অগাস্ট হত্যাকান্ডের শিকার নেতা-কর্মীদের লাশ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে চায়নি উল্লেখ করে সেদিন গ্রেনেড হামলার সময় পুলিশের নীরব ভূমিকা, আলামত ধ্বংসের চেষ্টা এবং হতাহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর উপর্যপুরী টিয়ারসেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ এবং হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়ায় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া এবং আহসানউল্লাহ মাষ্টার হত্যাকান্ডের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৭ অগাস্ট দেশের ৬৪ জেলার ৫শ’ জায়গায় একযোগে বোমা হামলা হল। বোমা, খুন, হত্যা নির্যাতন জিয়াউর রহমান থেকেই শুরু। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ঠিক একাত্তরের পাক হানাদার বাহিনীর প্রক্রিয়াতেই বিএনপি-জামায়াত হত্যাকান্ড এবং নির্যাতন চালিয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, সন্ত্রাসীদের মদদ দেয়া, অস্ত্রের চোরাকারবারী, মানি লন্ডারিং-এমন কোন অপকর্ম নেই যা বিএনপি-জামায়াত করেনি। এর মাধ্যমে তারা সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়া এসে আমাদের মেধাবী ছাত্রদের হাতে তার রাজনৈতিক দল করতে অস্ত্র ও অর্থ তুলে দিয়ে তাদের চরিত্র হনন করে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী বানিয়ে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট করেছে। বহু ছাত্রনেতা এদের হাতে জীবন দিয়েছে। ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭৫ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত ২১ বছর এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত মোট ২৯ বছর এদেশে এই অরাজকতার ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল।
তিনি বলেন, জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচার বন্ধ করে কারাগারে থাকা সাড়ে ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে মুক্ত করে দিয়ে তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দানের মাধ্যমে ব্যবসায়িকভাবেও প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে ঋণ খেলাপি’র কালচার শুরু করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি’র এটাও জানা উচিত, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান লঙ্ঘন ও মার্শাল ল’ জারি করে নিজেকে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করার সামিল। আর এই ক্ষমতা দখলকে অবৈধই ঘোষণা করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। সেটা যদি হয় তাহলে বিএনপি’র সৃষ্টিওতো অবৈধ হয়ে যায়। সেটাতো তাদের মনে থাকা উচিত’।
পলাশির প্রান্তরে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতাকারী মীরজাফরের সঙ্গে সে সময়কার রাষ্ট্রপতি মোশতাকের তুলনা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘মীরজাফরের মত সেও দুই মাসের বেশী ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। কিন্তু এই মোশতাকই জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান করেছিল। কারণ জিয়া মোশতাকের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিল।’
তিনি বলেন, ‘সেই জিয়াই পরে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান থাকার পাশাপাশি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেয়।’
কারবালায় নির্মম হত্যাকান্ডের সঙ্গে ১৫ আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের তুলনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেন কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো ৩২ নম্বরে। আমরা দুইবোন ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যাই।’
তিনি বলেন, ১৫ আগস্টে শুধু একটি পরিবারকে হত্যা নয়, দেশের ইতিহাস মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যার অবদান, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান তা মুছে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap