/বিচারপতি অপসারিত হবেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে

বিচারপতি অপসারিত হবেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে

জাতীয় সংসদে পাসকৃত বিচারপতি অপ-সারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছে, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রন সংসদ সদস্যদের একটি দলের (গ্রুপ) হাতে। এ ব্যবস্থায় দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা নেই কোনো সংসদ সদস্যের। এমনকি তার দল যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা নিদের্শনা দেয় তাহলেও তার বিরুদ্ধে ভোট বা মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তারা দলের নীতি নির্ধারক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। ৭০ অনুচ্ছেদ বলবত থাকাবস্থায় বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে গেলে একজন বিচারককে দলীয় নীতিনির্ধারকের করুনা অনুযায়ী চলতে হবে। রায়ে বলা হয়, সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের বিধানের বিরূপ প্রভাব নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহই নেই। এটা প্রধান বিচারপতির দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছে আপিল বিভাগ।

রায়ে বলা হয়, সংবিধানে সংসদের ক্ষমতা নির্ধারণ করা আছে। কোন ধরণের আইন প্রণয়ন করতে পারবে তা বলা আছে। তারা যেটা সরাসরি করতে পারে না সেটা পরোক্ষভাবেও করতে পারে না। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দেওয়া হয়েছে। তবে সে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রায়ে জাতীয় সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক থাকা উচিত বলেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে আদালত। আপিল বিভাগ বলেছে, আদালত কার্যক্রম নিয়ে সংসদেরও এমন কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়, যাতে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। এছাড়া সংসদ ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করা উচিত।

রায়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ৭ উপ-অনুচ্ছেদ পুনবর্হাল করা হয়েছে। এই পুন:র্বহালের ফলে এখন থেকে উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারিত হবেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতির মাধ্যমে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত করা হয়। রায়ে বিচারপতিদের জন্য ৩৯ দফা আচরণবিধিমালাও প্রণয়ন করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে এসব আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করলে গুরুতর অসদাচরণের শামিল হবে বলেও আপিল বিভাগের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির স্বাক্ষরের পর গতকাল মঙ্গলবার এ রায় প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মূল রায়টি লিখেছেন প্রধান বিচারপতি। এই রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে তাতে স্বাক্ষর করে নিজস্ব অভিমত দিয়েছেন বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা অবসরে যাওয়ায় তার পক্ষে রায়ে স্বাক্ষর করেছেন বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ থাকে না। এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদের স্থায়িত্ব ও দলের সদস্যদের মধ্যে শৃংখলা ধরে রাখার জন্য একটা ব্যবস্থা মাত্র। এটা দেশের জাতীয় রাজনীতিকে রাজনৈতিক বেচাকেনা থেকে দুরে রাখার জন্য। রায়ে বলা হয়, একজন সংসদ সদস্য যদি দরকষাকষির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বা সন্দেহ হয় যে তিনি দরকষাকষির সঙ্গে যুক্ত তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান সংবিধানে নেই। এ অবস্থায় তারা (সংসদ সদস্য) উচ্চ আদালতরে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা কিভাবে নিতে চান? রায়ে বলা হয়, ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার কারণে দলীয় নির্দেশনার বাইরে একজন সংসদ সদস্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সেখানে বিচারক অপসারণের বিষয়ে তারা কিভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে মত দেবেন, সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !