ভালো কাজের মূল্যায়ন করবে ইসি স্বীকৃতি হিসেবে মিলবে সম্মান ও নগদ অর্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি প্রায় প্রতিটি দপ্তরেই কর্মকর্তা-কর্মচারিদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে পদক দেয়ার  রেওয়াজ থাকলেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে কর্মরতদের ভাগ্যে এটি কোনোদিন জুটেনি। উপরন্তু বছরের পর বছর কাজ করেও যথাযথ মূল্যায়ন কিংবা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েই থাকতে হচ্ছে তাদের। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণে সঠিক কাজটিই করেন না অনেকে। কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে এবার নিজ প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনটি ক্যাটাগরিতে প্রজাতন্ত্রের এসব কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন হবে। ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মিলবে নগদ অর্থ এবং পদক। এ লক্ষ্যে একটা নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারিদের দু:সময়ে আর্থিক সহায়তা প্রদানে একটি কল্যাণ তহবিল গঠনের চিন্তা-ভাবনা করছে কমিশন; যার কারিগরি অসুবিধাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অবশ্য পদকের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে হলে সংশ্লিষ্টদের জাতীয় নির্বাচন কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন অথবা ভোটার তালিকা প্রণয়ন সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাতে হবে।
পাশাপাশি নিজেকে কাজে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখাতে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে হবে। এর মাধ্যমে সহকর্মীকে কৌশলে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতায় নামালো ইসি। তবে, এই কর্মক্ষতা দেখানোর কারণে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুফল পাবেন কি না সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে অবশ্য এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ এ বিষয়ে বলেন, কাজের স্বীকৃতির পুরস্কার পাওয়ার জন্য সহকর্মীকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হবে, এটা নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইতিবাচক। এতে পদক প্রাপ্তরা সামাজিকভাবে সম্মানিত হবেন। তিনি আরো বলেন, পদকের ক্যাটাগরি নির্ধারণ করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাশাপাশি নির্ধারিত কাজের জন্য টিমওর্য়াকভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নেবে। এতে কমিশনের সার্ভিসের গুণগত মান বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।

ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, ভালো কাজের জন্য পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে পদকের বিধান চালু রয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় সাংবিধানিক সংস্থার দায়িত্ব কম নয়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি নানা কারণে পিছিয়ে। নাগরিকদের পরিচিতি (ভোটার তথ্য) সংরক্ষণ, রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন করার ক্ষমতা দেয়া আছে কমিশনকে। এখানের কর্মকর্তাদের নিরলসভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু স্বীকৃতি নেই কোন কাজের। যুগ যুগ ধরে সমালোচনার পাত্র হয়ে বছরের পর বছর পার করছে। কমিশনের

ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. হেলালুদ্দীন দায়িত্বে এসে নানা সংস্কারমূলক কাজের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কাজের স্বীকৃতি মূল্যায়ন এবং তাদের দু:সময়ে একজন আরেকজনের পাশে মানবতা হিসেবে দাঁড়াতে কল্যাণ তহবিল গঠনের চিন্তা শুরু করেন। ইতিমধ্যে পদক চালুর বিষয়টি একটি নীতিমালার আলোকে প্রণয়ন করতে খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে জনপ্রশাসন পদক নীতিমালার আলোকে পদের নাম নাম, শ্রেণি, ক্ষেত্র, প্রকৃতি, অবদানের প্রকৃতি, পদক প্রদান কার্যক্রম ব্যয় ও ব্যয়ের খাত নির্ধারণের করা হয়েছে। এতে পদের নাম ‘নির্বাচন পদক’, ব্যক্তি এবং দলগত এই দুই শ্রেণিতে পদক প্রদান করা হবে। পাশাপাশি সাধারণ ও কারিগরিসহ মোট তিন শ্রেণিতে পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত রয়েছে নীতিমালায়। সাধারণ ও কারিগরি ক্ষেতে শ্রেষ্ট ব্যক্তি ও শ্রেষ্ট দলকে মোট ৪টি পদক প্রদান করা হবে। পদক প্রাপ্তদের দেয়া হবে ক্রেস্ট, নগদ অর্থ ও সম্মাননা।

নীতিমালার তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, সাধারণ ক্যাটাগরিতে যে পদক দেয়া হবে তার মধ্যে সাধারণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা। কারিগরি ক্যাটাগরিতে বিজ্ঞান এবং তথ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও গবেষণা (বিজ্ঞানভিত্তিক)। আবদানের প্রকৃতির মধ্যে বলা হয়েছে, সংস্কার, ধারাবাহিক ব্যতিক্রম ও উন্নত অনুশীলন প্রদর্শন, দলগত উদ্যেগে উৎসাহীতকরণ, দক্ষ প্রশিক্ষক, উন্নততর সেবা, সুশাসন, তথ্য প্রযুক্তির প্রসার বা ই-গর্ভনেন্স প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের অংশগ্রহণ, সম্পৃক্ততা ও ভূমিকা বৃদ্ধি, স্থায়ী প্রকৃতির উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি, টেকসই ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি হ্রাস, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও জেন্ডার সমতা।

পদক বাছাই প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ইসির ১০টি আঞ্চলিক অফিসের জন্য সমসংখ্যাক বাছাই কমিটি এবং কেন্দ্রিয়ভাবে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। আঞ্চলিক কমিটিতে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ৬ষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত এবং কেন্দ্রিয় কমিটিতে ৫ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ এবিষয়ে বলেন, ভালো কাজের মূল্যায়ন না থাকলে অধীনস্থদের কাছ থেকে কাঙ্খিত সেবা পাওয়া যায় না। পদক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সেই শূন্যতা দূর হবে। কারণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ইসির নির্বাচনের বাইরেও অনেক কর্মপরিধি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনীসহ প্রশাসননে ভালো কাজের স্বীকৃতির বিধান চালু রয়েছে। তাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি কেন পিছিয়ে থাকবে, এই বোধদয় থেকে ইতিবাচক এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন করে যেতে পারলে স্বাধীন ইসিতে এটি অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।