/রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছু মোটাদাগের কথা

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছু মোটাদাগের কথা

মিয়ানমার সরকার তাদের দেশে ৭০০-৮০০ বছর ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সামরিক অভিযান চালিয়ে, গণহত্যা চালিয়ে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাংলাদেশে বিতাড়িত করছে। ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো পাঁচ লাখের মতো রোহিঙ্গা বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে বিতাড়িত করছে। প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অবর্ণনীয়। বিশ্বজুড়ে জনগণ মিয়ানমার সরকারের ভূমিকার নিন্দায় মুখর।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়নকে কেন্দ্র করে সমস্যার প্রকৃতি বোঝার জন্য রোহিঙ্গাদের ইতিহাস-ভূগোল নিয়ে বহু তথ্য প্রচারমাধ্যমে আসছে। নানা মহলের গবেষণার মাধ্যমেও উন্মোচিত হচ্ছে নানা তথ্য ও ঘটনা। এসবের মধ্যে নানা মতলবে কোনো কোনো মহল থেকে মিথ্যা প্রচার দিয়ে সমস্যাকে জটিলও করে তোলা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জনমত আর বিভিন্ন দেশের সরকারের মত একরকম নয়।

প্রতিটি দেশেরই সরকার চলছে আগে থেকে চলে আসা পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো দেশের সরকারই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করছে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালেও এমনটিই ঘটেছিল। প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকার চলছিল আগে থেকে চলে আসা তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে। তবে গোটা পৃথিবীর জনমত ছিল বাংলাদেশের পক্ষে, পাকিস্তান সরকারের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে।
রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে তাতে বোঝা যায়, সমস্যা অতি পুরনো ও অত্যন্ত জটিল। ৭০০-৮০০ বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকানে বসবাস করা সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করছে না। বৃহত্ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে সমস্যাটিকে ব্যবহার করে আসছে। কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন যে সুপারিশ ঘোষণা করেছিল, বাংলাদেশ তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে আসছে। এখনো সফল হয়নি। বৃহত্ শক্তিগুলোর কূটনীতি সমস্যাকে জটিল করে চলেছে। মিয়ানমার সরকারের বেপরোয়া ভূমিকার সামনে বাংলাদেশ সরকারকে অসহায়ের মতো দেখা যাচ্ছে।

রোহিঙ্গারা ধর্মে মুসলমান। বার্মিজরা বৌদ্ধ। ধর্ম-সম্প্রদায়গত বিরোধ মিয়ানমারে আছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম চেতনা ও জাতীয়তাবাদী রোহিঙ্গা চেতনা আছে। আছে তিন-চারটি চরমপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন। ইসরায়েলের মোসাদ, পাকিস্তানের আইএসআই তাদের মধ্যে সক্রিয় আছে বলে খবর প্রচারিত হচ্ছে। আরাকানকে স্বতন্ত্র, স্বাধীন, মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা আছে বলেও খবর প্রচারিত হচ্ছে। এসব ঘটনা মিয়ানমার সরকারকে বিচলিত করেছে।

চীন ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। অনেক সরকার ও কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ মানবিক বিপর্যয় দেখে সেদিক থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের ভূমিকার খুব প্রশংসা করছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর জাতিসংঘ তো শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোরই সংঘ।

রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সিভিল সোসাইটি সেভাবে উপলব্ধি করছে বলে মনে হয় না। তাদের বক্তব্যেও পারস্পরিক ভিন্নতা ফুটে ওঠে। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ আগের অবস্থানে থেকে বিএনপিকে আক্রমণ করে চলেছে। বিএনপি সম্পূর্ণ আগের অবস্থানে থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং সরকারের বিরূপ সমালোচনা করছে। সিএসও ও এনজিও মহল তাদের অবস্থানে থেকে কথা বলছে এবং কাজ করছে। ইসলামী দলগুলো মিয়ানমারের ভূমিকার বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদে বেশি সক্রিয়। এই বহুত্ববাদী বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় অনৈক্য প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুত্ববাদ দারুণ জাতীয় অনৈক্যের পরিচয়কে প্রকটিত করছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুর্যোগের মুহূর্তে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে ঐক্যহীন ও দুর্বল প্রমাণ করছে। আমরা চাই, বহুত্ববাদ নয়, বহুত্বমূলক সংহতি; আমরা চাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে ঐক্য। এনজিও ও সিএসও মহল থেকে প্রচারিত বহুত্ববাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের কোনো সম্ভাবনাই এখন দেখা যাচ্ছে না।

রাষ্ট্র হলো জাতীয় চেতনার বাস্তব রূপ। যে জনসমষ্টির মধ্যে জাতীয় চেতনা ও জাতীয় ঐক্য থাকে না, সেই জনসমষ্টি নিজেদের জন্য নিজেদের চেষ্টায় নিজেদের থেকে কোনো রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশে অবস্থিত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাস অভিমুখী, ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী, দিল্লি অভিমুখী। বাংলাদেশের উচ্চ শ্রেণির লোকেরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলেছেন। তাঁদের অনেকে নিজেরাও এসব দেশের নাগরিক হয়েছেন। তাঁদের অনেকে বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছেন, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো থেকেও যাচ্ছেন। এনজিও ও সিএসওদের সম্পর্কে অনেকের ধারণা, তারা বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। এ অবস্থার মধ্যে এখন রোহিঙ্গাদের বোঝা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ কী করতে পারে?

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আরো অনেক আগেই বাংলাদেশের বোঝা দরকার ছিল। বুঝে কাজ করা দরকার ছিল। এখন সমস্যা যে পর্যায়ে গেছে এবং বাংলাদেশ সরকারের ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে অবস্থা, তাতে বাংলাদেশ কী করতে পারবে? বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার দুর্দশাগ্রস্ত বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায়। বাংলাদেশ তাদের মিয়ানমারের নাগরিক মনে করে। বাংলাদেশ চায়, মিয়ানমার তাদের ফেরত নিক এবং নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের সচ্ছল-সম্মানজনক জীবনের অধিকারী করুক। মিয়ানমার তাদের মিয়ানমারের লোক মনে করে না এবং তাদের ফেরত নেবে না বলে ঘোষণা দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সব কথার অর্থ বোঝা যায় না। সরকার কী করছে বা কী করতে চাইছে?

বাংলাদেশের জনগণের, সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর ও বিশিষ্ট নাগরিকদের আশু কর্তব্য—

১. রোহিঙ্গারা আর যাতে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা।

২. যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে গেছে, তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা। মিয়ানমার সরকারকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে হবে। এর জন্য আন্তর্জাতিক জনমত, কূটনীতি ও জাতিসংঘের ভূমিকা দরকার।

৩. রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইনে ও আরাকানে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পায় এবং সচ্ছল ও সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হতে পারে, তার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো।

বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। যে রোহিঙ্গারা বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে এসে গেছে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে না পারা পর্যন্ত তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাংলাদেশকে পালন করতে হবে। এখানে যে তিনটি আশু করণীয় নির্দেশ করা হলো, বাংলাদেশ যদি আগামী তিন মাসের মধ্যে সেগুলো করতে পারে, তাহলে তা হবে সরকারের জন্য অসাধারণ গৌরবজনক কাজ ও বাংলাদেশের জন্য পরম কল্যাণকর কাজ। আগামী তিন মাসের মধ্যে যদি সেগুলো বাংলাদেশ করতে না পারে, তাহলে ৩০ বছরের মধ্যেও এমনকি ৩০০ বছরের মধ্যেও করতে পারবে না। যে অবস্থা চলছে তাতে তিন মাসের মধ্যে এগুলো করা না গেলে বাংলাদেশের জনসাধারণকে নিজেদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।

যাঁরা বিদেশমুখী, যাঁরা এনজিও ও সিএসওর কর্তা, তাঁরাই বাংলাদেশের নেতৃত্বে আছেন। সরকারি দল, সরকারের বাইরের দল, ডানপন্থী দল, বামপন্থী দল—সবাই কিন্তু জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে বিশ্বব্যাংকের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক কার্যত বিশ্ব সরকাররূপে কাজ করে চলেছে। বাংলাদেশের নেতৃত্ব যে ধারায় কাজ করছে, তাতে বাংলাদেশে জাতি থাকছে না। জাতি ছাড়া, জাতীয়তাবোধ ছাড়া রাষ্ট্রবোধ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না। বাংলাদেশেই যাঁরা থাকছেন এবং থাকবেন, নিজেদের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য তাঁদের জাতি ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। এটা না করলে বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যে কী ঘটবে তা ভাবা যায় না। বাংলাদেশে রাজনীতির উন্নতির প্রতিই বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের এখন কেন্দ্রীয়ভাবে মনোযোগী হওয়া উচিত। সংকট শুধু রোহিঙ্গা নিয়ে নয়, বড় বড় সংকট সামনে আরো আসবে। বাংলাদেশ শক্তিশালী হলে, বাঙালি জাতি শক্তিশালী হলে অবশ্যই সব সংকট কাটিয়ে প্রগতির পথে, সভ্যতার পথে, সংস্কৃতির পথে এগোনো যাবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক/লেখক : সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !