শতভাগ নিরাপদ পানির সংস্থান

সুস্থভাবে জীবন ধারণের জন্য নিরাপদ পানির সংস্থান পহেলা নম্বর শর্ত। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি তথা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০-এর ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৬ নম্বরটি হইল—‘সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।’ ইহা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার আগেই বাংলাদেশের শতভাগ মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণের আশা ব্যক্ত করিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমপ্রতি একটি আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনে তিনি এই আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি জানাইয়াছেন, ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির আওতায় আসিয়াছে। ২০৩০ সালের পূর্বেই শতভাগ মানুষকে ইহার আওতায় আনয়নের জন্য কাজ করিতেছেন তিনি।

অত্যন্ত কঠিন এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বপালনের অঙ্গীকার করিয়াছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কঠিন এই কারণে যে, শতভাগ বিশুদ্ধ পানির সংস্থান করিবার কাজটি পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের জন্যও সহজ নহে। বিশ্বে শতকরা এক ভাগেরও কম পানি পানের জন্য নিরাপদ। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় ১০৭ কোটিরও বেশি মানুষ নদী অববাহিকায় বসবাস করিয়াও নিরাপদ পানির চাহিদা মিটাইতে ব্যর্থ হইতেছে। তাহা ছাড়া, মনুষ্যসৃষ্ট ৮০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রকৃতিতে মিশিয়া বৃহত্ আকারে পরিবেশকে দূষিত করিতেছে। কেবল নিরাপদ পানির অভাবে পৃথিবীতে বত্সরে ১০ লক্ষ মানুষ মারা যায়, যাহাদের অধিকাংশই শিশু। দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, আমাশয়, গ্যাস্ট্রিক আলসার, ত্বকের নানা রোগ এমনকি ক্যান্সার পর্যন্ত হইতে পারে। সমপ্রতি ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগী বৃদ্ধির নেপথ্যে দূষিত পানিকে দায়ী করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। চিকিত্সকরা মনে করেন, দূষিত পানিতে অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যাহা মানুষের প্যানক্রিয়াস তথা অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা হ্রাস করিয়া দেয়। ফলে ইনসুলিনের স্বাভাবিক নিঃসরণ বন্ধ হইয়া মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। তাহা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরিয়া দূষিত পানি ব্যবহার করিলে শরীরে টক্সিন তথা বিষাক্ত পদার্থ জমা হয়, যাহা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা হ্রাস করিয়া দেয়। বাংলাদেশের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দেশে বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে ৩৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পাইতেছেন। তাহা ছাড়া, দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসাবে দেশের বৃহত্তর অংশে ফি বত্সর কমবেশি বন্যা হয়। এই বন্যার সমস্যা কোনো কোনো বত্সর অত্যন্ত ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। বন্যাকালীন ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পানি দুষ্প্রাপ্য হইয়া পড়ে।

সুতরাং বাংলাদেশের জন্য শতভাগ নিরাপদ পানির সংস্থান করিবার চ্যালেঞ্জ মোটের উপর সহজসাধ্য নহে। দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে হইবে। অন্যদিকে, শতভাগ নিরাপদ পানি সংস্থানের মাধ্যমে আমরা সবদিক দিয়াই উন্নতির সোপান টপকাইতে পারিব। ইহার গুরুত্ব সীমাহীন।