/শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন

নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা আর উৎসবমুখর পরিবেশে আজ সকাল ৮টা থেকে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। প্রত্যেকটি কেন্দ্রেই সকাল থেকে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ফলাফল আসতে শুরু করেছে। এ ফলাফলে আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এগিয়ে রয়েছেন।
নির্বাচন শেষে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ভালোভাবে সম্পন্ন হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।’
আজ আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সচিব বলেন, ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে অনিয়মের কারণে ৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। বাকি ৪১৬টিতে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কমিশন ভোটে বিন্দুমাত্র অনিয়ম বরদাস্ত করেনি। কমিশনের নির্দেশেই অনিয়মের কারণে ৯টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। বিন্দুমাত্র অনিয়মের অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটানিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডল জানান, তিনি ১৪টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এর মধ্যে সবগুলো কেন্দ্রে নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘শতাধিক কেন্দ্রে ভোটে অনিয়োম হয়েছে’ বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আইন ও বিধি অনুযায়ি এই সকল কেন্দ্রের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। তবে মোট ৪২৫টি কেন্দ্রের মধ্যে অধিকাংশ কেন্দ্রে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ সকালে মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ৩০ নং ওয়ার্ডের কানাইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেন। অপরদিকে বিএনপি মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার সকাল সোয়া ৮ টায় টঙ্গীর ৫৪ নং ওয়ার্ডের বশির উদ্দিন উদয়ন একাডেমী কেন্দ্রে ভোট দেন।
জয়দেবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সকাল ৮টা থেকে ভোট শুরু হলে নারী পুরুষ বিশাল লাইন দিয়ে ভোট প্রদান করেন। এই কেন্দ্রেই দুপুর ১২টার দিকে ভোট প্রদান করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি ভোট প্রদান শেষে বাসসকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার গাজীপুরবাসী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট প্রদান করছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পক্ষে গাজীপুরবাসী সবসময়ই ঐক্যবদ্ধ এবং শান্তিপ্রিয়।
সকাল ১১টার দিকে টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ জাহিদ আহসান রাসেল এমপি। তিনি ভোট প্রদান শেষে বলেন, গাজীপুর সিটিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সকাল ৯ টায় গাজীপুর শহরের হাড়িনাল হাইস্কুল কেন্দ্রে ভোট প্রদানকালে এলাকার বিশিষ্ট ভোটার আলমগীর হোসেন দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দান শেষে বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছি। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৩২৫ জন। সিটি কর্পোরেশনের ৩৯ নং ওয়ার্ডে হায়দরাবাদ ভোট কেন্দ্রে সকাল ১১টায় ভোট প্রদানকালে স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুদুল হাসান বিল্লাল বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা ভোট দিতে পারছেন। এই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার তুষার চক্রবর্তী বলেন, এখানে ২৪১৭ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩০ ভাগ ভোট ১১টার আগেই পড়েছে। এখানে ২৩৫৩ জন নারী ভোটারের জন্য আলাদা কেন্দ্র রয়েছে।
গাজীপুর সিটির ২৬ নং ওয়ার্ডের শহীদ স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেছেন রওশন আরা নুপুর নামে একজন ভোটার। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই ভোট প্রদান করেছি।
জানা গেছে, ভোটগ্রহণে নির্বাচন কমিশন কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি নির্বাচনী অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে কমিশন এবারই প্রথম ভোট গ্রহণ পরিস্থিতির তথ্য তাৎক্ষণিক জানার ব্যবস্থা নেয়। প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে দু’ঘণ্টা পরপর প্রয়োজনীয় সার্বিক তথ্য কমিশন সচিবালয়কে জানায়। তাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয় কমিশন। ভোট কেন্দ্রে কোনো অঘটন বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কর্মকর্তারা এসএমএসের মাধ্যমে কমিশনকে জানানো নির্দেশনা ছিল কর্মকর্তাদের উপর। এক্ষেত্রে কমিশন ঢাকায় বসে এসব এসএমএসের তথ্য অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী-কর্মী-সমর্থকদের গতিবিধি এবং সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনসহ সব কিছু সাধারণ পোশাকে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করেছেন ইসির নীরব পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, এই সিটি কর্পোরেশনে ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ জন ও নারী ভোটার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১ জন। এ নগরীতে নতুন ভোটার ১ লাখ ১১ হাজার।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরা হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম (নৌকা), বিএনপির মো. হাসান উদ্দিন সরকার (ধানের শীষ), ইসলামী ঐক্যজোটের ফজলুর রহমান (মিনার), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. নাসির উদ্দিন (হাতপাখা), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মো. জালাল উদ্দিন (মোমবাতি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কাজী মো. রুহুল আমিন (কাস্তে) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফরিদ আহমদ (টেবিল ঘড়ি)।
৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠিত। এসব ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩৩৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৫৬টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৫৪ জন। এ ছাড়া সংরক্ষিত ১৯টি ওয়ার্ডে ৮৪ নারী কাউন্সিলর নির্বাচন করছেন।
এবার এই সিটিতে ৬ কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেয়া হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিবেচনায় সিটির কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার সহায়তায় ভোটগ্রহণ করছে কমিশন।
প্রায় ৩৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ৬ জুলাই। এবার এর দ্বিতীয় নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ২৪ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। ১৫ মে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ এবং পরে আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার ভোট অনুষ্ঠিত হয়।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !