/শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ

শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ

কোনো রকম সংঘাতে না জড়িয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চায় বাংলাদেশ। এবার আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছে। এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে নিউইয়র্কে শুরু হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি বড় পরিসরে আলোচনার জন্য বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ।

নিউইয়র্কের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, গত ৩০ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এরপর থেকে গত তিন দিনে জাতিসংঘের সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রেখে চলেছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানির পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। এসব দেশ ও জোটকে বাংলাদেশ পাশে পাওয়ার আশা করছে।

ঢাকা ও নিউইয়র্কের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এবার রোহিঙ্গারা যেভাবে বাংলাদেশে স্রোতের মতো ঢুকছে, তাকে নজিরবিহীন বলছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে এর মধ্যেই সোয়া লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। অপেক্ষমাণ আরও এক লাখের মতো রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশ আশ্রয় দেবে। এ জন্য বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

তিন দশক ধরে মিয়ানমারের হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ, যা দেশটির জন্য বড় একটি বোঝা। বিষয়টি সমাধানে দুই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। প্রথমত, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধান করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশকে সংবেদনশীল করা। বাংলাদেশ চায় রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি হলে সেখানকার সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে থাকতে পারে। এটি বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশ বলছে। এটি করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সহজ হবে।

সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিছিন্নতাবাদী বা উগ্রপন্থীদের দমনের অজুহাত দেখিয়ে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী তাদের অভিযান পরিচালনা করে থাকে। সীমান্ত নিরাপদ রাখা এবং উগ্রবাদ দমনসংক্রান্ত একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ জন্য বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস প্রতিষ্ঠা, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে সিকিউরিটি কো-অপারেশন চুক্তি, সীমান্তে যৌথ টহল এবং সর্বশেষ গত সপ্তাহে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আসন্ন বৈঠকে বিষয়টি বড় আকারে আলোচনা হবে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে একাধিক দেশ রাখাইনের অভ্যন্তরে একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, যার প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন আছে। রোহিঙ্গারা বর্তমানে যেভাবে বাংলাদেশে ঢুকছে, তাতে সরকার উদ্বিগ্ন। তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কাল শুক্রবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব শাহ্ কামাল কক্সবাজারে যাচ্ছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী এলাকায় অস্থায়ীভাবে কীভাবে রেখে মানবিক সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে।

জানতে চাইলে শাহ্ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার স্থানীয় জেলা প্রশাসককে নিয়ে ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শনের পর পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে সরকার বেশ চিন্তিত। তাদের আশঙ্কা, ইতিমধ্যে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে ঢাকায় মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অং মিনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এ সময় বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছে ঢাকা। এ বিষয়ে ঢাকার গভীর উদ্বেগের বিষয়টিও অং মিনকে জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের চলমান সহিংসতা বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সহিংসতা থেকে বাঁচতে বিপুলসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক লোক প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত রাখাইনের ১ লাখ ২৫ হাজার লোক বাংলাদেশে এসেছে। আরও ১ লাখের বেশি বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক লোকের ঢল বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের অবিলম্বে ফিরিয়ে নিতে হবে। মিয়ানমারকে রাখাইন রাজ্যের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আর পালিয়ে না আসে। এর আগেও কয়েক দফায় আসা মিয়ানমারের প্রায় ৪ লাখ লোককে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশ বারবার রাখাইনের অব্যাহত সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার শিকার হতে চায় না। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের হাতে অনানুষ্ঠানিক পত্র দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালক।

এই পরিস্থিতিতে রাখাইনে অবিলম্বে সহিংসতা কমাতে মিয়ানমারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে মিয়ানমারের লোকজনের বাংলাদেশে আসা বন্ধ করতে বলেছে। তা ছাড়া রাখাইনের এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সমস্যার মূল উৎসে গিয়ে সমাধান করতে হবে। সীমান্তের শূন্য রেখার কাছে ভূমি মাইন পেতে রাখার বিষয়েও বাংলাদেশ উদ্বেগ জানিয়েছে।

তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিন এরদোয়ান ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেগলুত কাভাসোগলুর আজ ভোরে ঢাকায় আসার কথা। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে আজই তাঁরা কক্সবাজার সফর করবেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তাঁদের সঙ্গে থাকবেন। কক্সবাজার থেকে বিকেলে ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন মেগলুত কাভাসোগলু।

শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ

মিয়ানমারের সহিংসতার কবলে পড়া শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাখাইনে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গার ৮০ শতাংশের বেশি হচ্ছেন নারী ও শিশু। এর মধ্যেই বাংলাদেশে ইউনিসেফ আশ্রয় নেওয়া শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পানীয় ও পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে বাড়তি উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে রাখাইনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ইউনিসেফকে কাজ করতে না দেওয়ায় সেখানকার প্রায় ৩২ হাজার শিশুকে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !