শৈত্যপ্রবাহ ঘন কুয়াশা ও শিশিরে ঘরবন্দী উত্তরাঞ্চলের মানুষ

দৃষ্টি সীমা এক ফুটেরও কম। চারদিকে ঘিরে ফেলেছে ঘন কুয়াশা। যেন কুয়াশার দেশ। বাড়িঘর গাছগাছালি কিছুই দৃশ্যমান নয়। ঘরের বাইরে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভিজে যাচ্ছে পরিধেয় কাপড়। মনে হবে হালকা বৃষ্টি। ঘরের ভেতরেও স্বস্তি নেই। জানালা দরজা বন্ধ হলে কি হবে, ভেন্টিলেটর দিয়ে প্রবেশ বাধাহীন কুয়াশার। রবিবার সকালে বগুড়ায় ঘন কুয়াশার সাঁড়াশী আক্রমণে দিশেহারা হাজারও মানুষ। সকাল দশটাকে মনে হচ্ছিল কেবলই রাত শেষের ভোর। পাখিরাও বুঝতে পারেনি, রাত কেটেছে কিনা! নগরীর কেন্দ্রস্থল সাতমাথা সকাল পেরিয়েও প্রায় জনশূন্য। স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রকৃতির শীত এবার সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে। শৈত্যপ্রবাহের আক্রমণ দুই দিন কিছুটা বিরতির পর ফের যুদ্ধ। সঙ্গে এনেছে আকাশ পথের আরেক অস্ত্র ঘনকুয়াশা। নিচে নেমে এসেছে মেঘমঞ্জরি। বিমানের গোলার মতো নিক্ষিপ্ত হচ্ছে তীব্র শীতের রাসায়নিক অস্ত্র শিশির। শীত যুদ্ধে মানুষ যে কোথা পালাবে সেই অবস্থা নেই। কারফিউয়ের মতো ঘরবন্দী করে ফেলেছে। শীতের আক্রমণ প্রতিহত করতে বর্মের মতো পশমি মোটা কাপড় পরেছে মানুষ। গোটা শরীর আবৃত করেছে। মুখমন্ডল ঢেকে শুধু দুটি চোখ বের করে রেখেছে। শীতের আক্রমণ ঠেকাতে এমন বর্মেও বরফের তীর বিঁধে যাচ্ছে।

শীতে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে মানুষ। শীত কাবু আহত মানুষেরা রাতে বিছানায় লেপের নিচে ঢুকে উষ্ণতা পাবে- তাও থাকছে না। কুয়াশা ঘরে ঢুকে লেপ কম্বলও দখল কেরে ফেলেছে। লেপের সঙ্গে রেসলিং, মল্লযুদ্ধ করেও উষ্ণ করা যাচ্ছে না। উচ্চবিত্তের ঘরে রুম হিটার ও ওয়াস রুমের গীজারে হয় তো শীতকে কিছুটা প্রতিহত করা যাচ্ছে। যাদের ঘরে এগুলো নেই তারা শীত যুদ্ধে টিকতেই পারছে না। শীতের সঙ্গে লড়াই করতে নগরীর অনেক বাড়িতে মাটির চুলা কিনে চারকোলে আগুন ধরিয়ে কিছুটা রক্ষা পাচ্ছে। তবে এই ধরনের চুলার আগুনে বিপদও ঘটতে পারে। ধোঁয়ায় ঘর বদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

শীতের যুদ্ধে নগরীর মানুষ জয়ী হতে পারছে না। তবে গ্রামের কৃষক শীতকে অনেকটাই প্রতিহত করেছে। তীব্র শীতের মধ্যেও তারা যাচ্ছে ফসলের মাঠে। এই সময় বোরোর বীজতলা, আলু, সরিষা, সবজি রক্ষায় তারা ব্যস্ত। বগুড়ার সোনাতলার রানীরপাড়া গ্রামের কৃষক বাসেত বলেন, ‘শীত তুই যত হামলা চালাবু হামরা তোক খ্যেদে দিয়্য দম (শীত যত হামলা চালাবে আমরা তা তাড়িয়ে দিয়ে ক্ষান্ত)।’ আরেক কৃষক রফিকুল বলেন, ‘শরের মানুষ কম্বলের লাগান মোটা কোট জ্যাকেট গাওত দিয়্যা লড়ব্যর পারে না। দেকেন হামরা মাফলার মুখমুড়ি দিয়া চাদর পরে জমিত যাচ্চি। শীতক হামরা ইঙ্কে করে‌্য খায়া ফালামু (নগরীর মানুষ কম্বলের মতো মোটা কোট জ্যাকেট পরিধান করে নড়াচড়া করতে পারে না। আর দেখুন আমরা মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে চাদর পরে জমিতে যাচ্ছি। শীতকে আমরা এভাবে খেয়ে ফেলবো)।

এবারের শীতের তীব্রতা নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে গবেষণা শুরু হয়েছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে, মেডেল জুলিয়ান অসিলেশন (এমজেও) নামের একটি প্রক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ায় এই অবস্থার জন্য দায়ী। এটা বিষুব রেখার চারদিকে প্রতি ৩০ থেকে ৬০ বছর অন্তর পূর্বদিকে চলে। এ বছর বিরাজমান লা নিনা এমজেওকে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পূর্ব দিকে ঘুরতে বাধা দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘায়িত শীতল অবস্থার সঙ্গে ঘন কুয়াশা অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

রাজশাহী অঞ্চলে ফের শৈত্যপ্রবাহ ॥ স্টাফ রিপোর্টার রাজশাহী থেকে জানান, টানা দুই সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহের পর মাঝে দু’দিন অনেকটায় স্বাভাবিক অবস্থা দেখা দিলেও রাজশাহী অঞ্চলে ফের শুরু হয়েছে শৈত্যপ্রবাহ। রাজশাহীর তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও কমছে না শীতের তীব্রতা। অব্যাহত তীব্র শীতে দুর্ভোগের মধ্যেই রয়েছে এ অঞ্চলের শীতার্ত মানুষ। এবার শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে এসেছে ঘন কুয়াশা। রবিবার সকাল থেকেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে পুরো রাজশাহী অঞ্চল। বেলা ২টার দিকে সামান্য রোদের দেখা মিললেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রবিবার রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

এদিকে ঘনকুয়াশা ও হাড় কাঁপানো শীতে কাবু হয়ে পড়ছেন শহরের পথে-ঘাটে থাকা ছিন্নমূল মানুষগুলো। এবার টানা শৈত্যপ্রবাহের পর আবারও শীতের প্রকোপ ভর করেছে রাজশাহী অঞ্চলে। রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, রাজশাহীতে মৃদ শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ঘনকুয়াশায় চাদরে ঢাকা পড়েছে রাজশাহী। দিনের বেলাতেও সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল করছে ঝুঁকির মধ্যে হেডলাইট জ্বালিয়ে।

অপরদিকে দীর্ঘ শীত ও ঘন কুয়াশায় এবার রবিশষ্য ক্ষেত নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক। এরই মধ্য নষ্ট হয়েছে পান বরজ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আলুর ক্ষেত। আর বোরোর বীজতলায় দেখা দিয়েছে ক্লোন্ড ইনজুরি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, এ বছর শুরু থেকেই শীতের প্রকোপ অনেক বেশি। তবে এমন আবহাওয়া রবি শস্যের জন্য কাল হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক রয়েছেন। বর্তমানে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পরিদর্শন করছেন। ফসলকে নিরাপদ রাখতে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, কৃষকরাও আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়ে উঠেছেন। মোবাইল এ্যাপস ও হট লাইনের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টাই কৃষি তথ্য সেবা নিচ্ছেন। ফসলের পরিচর্যাও করছেন বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের এই উর্ধতন কর্মকর্তা।