সব স্তরেই বাংলা এখনো উপেক্ষিত

বাংলা ভাষা প্রচলন আইন না মানলে অসদাচরণের অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু গত ২৮ বছরে কারও বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এই আইন ছাড়াও সব সরকারের সময় আদেশ-নির্দেশের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। ভাষাসৈনিকেরাই বলছেন, বাংলার ব্যবহার দিন দিন কমছে, আর বাড়ছে ভুল বাংলার প্রয়োগ।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত সরকারের বড় উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূল সংবিধান, ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, উচ্চ আদালতের ২০১৪ সালের রায় এবং জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ সরকারের সময়ের এক ডজনেরও বেশি আদেশ, পরিপত্র বা বিধি থাকলেও সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। বিভিন্ন নামফলক, উচ্চ আদালতের রায়, উচ্চশিক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো হচ্ছে ইংরেজিতে অর্থাৎ অ-রাষ্ট্রভাষায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যখন আইন ছিল না, তখন মানুষ ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, জীবন দিয়েছে এবং প্রাত্যহিক জীবনে বাংলা ভাষা ব্যবহার করেছে। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার প্রতি মানুষের উদাসীনতা বাড়ছে। এর মূল কারণ সদিচ্ছার অভাব।
এদিকে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কেবল সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় বেসরকারি কাজকর্মে এ-সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই। যদিও উচ্চ আদালতের রায়ে সরকারি, বেসরকারি—সব ধরনের প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বরং বিচার বিভাগকে সালাম জানাই। কারণ, প্রত্যক্ষ কাজ না হলেও বিচারকেরা বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে ভেবেছেন, এটা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
১৯৮১ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ (বাবাকো) প্রতিষ্ঠা হয়। সেই কোষের কার্যক্রমও চলছে ঢিমেতালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাবাকো এ পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৪টি আইন, বিধি ও অধ্যাদেশ প্রমিতিকরণ করেছে। এ ছাড়া অন্য সব মন্ত্রণালয়ের ৫৭টি আইন বা অধ্যাদেশ প্রমিতিকরণ করেছে। অথচ শত শত আইন এখনো ইংরেজিতে রয়েছে, যেগুলোর অনুবাদের পর বাবাকোর প্রমিতিকরণ করার কথা। এ পর্যন্ত বাবাকোর অর্জন হচ্ছে, প্রশাসনিক পরিভাষা, পদবি পরিভাষা ও সরকারি কাজে ব্যবহারিক বাংলা—এই তিনটি পুস্তিকা প্রণয়ন করা। সচিবালয় নির্দেশিকা ২০১৪ প্রণয়নে বাবাকো সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছে।
বাবাকোর কর্মকর্তারা জানান, ভাষা ব্যবহারের হালচাল দেখতে তাঁরা জেলা প্রশাসনের কাজকর্মের ওপর জরিপ ও মূল্যায়ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, সঠিক অনেক শব্দ এখন পর্যন্ত মাঠে ব্যবহার করা হচ্ছে না। তবে জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত বাংলার ভুল ব্যবহার হচ্ছে অনেক। ঢাকায় যে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা নজরদারি করেন, সেখানে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো।
তবে মাঠের পরিস্থিতি খারাপ বলে বাবাকো সেখানে যেতে চায়। এর কার্যপরিধিতেও বিষয়টি উল্লেখ আছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কোষের মোট জনবল ছিল ২৩ জন, এটা কমিয়ে ১২ জন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গেলে বিদ্যমান এই জনবল দিয়ে তা করা সম্ভব নয়।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসনসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বাবাকো কাজ করে যাচ্ছে। তবে সরকারি কাজকর্মে বাংলা ব্যবহারে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে এটা আরও হতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলার ব্যবহার নিয়ে যত উদ্যোগ: সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।’ ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষণা দেন, বাংলা হবে দেশের সরকারি ভাষা।
বাংলা ভাষা প্রচলন আইন হয় ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ। ওই বছরের ১২ এপ্রিল সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন যে, ভবিষ্যতে সকল নতুন আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ইত্যাদি অবশ্যই বাংলায় প্রণয়ন করিতে হইবে।’ ১৯৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভা নয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১০ সচিবের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। এর কয়েক মাস পর ৩ মে বঙ্গভবনের আদেশে বলা হয়, সব নোট, সার-সংক্ষেপ বা প্রস্তাবটি বাংলায় উপস্থাপনা করা না হলে রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করবেন না। ৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত আদেশটি সবাইকে অবহিত করে।
১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা বারবার সকল স্তরে বাংলা প্রচলনের আদেশ দিলেও আংশিক কার্যকরী হইয়াছে, কোথাও হয়নি।’ এতে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার অনভিপ্রেত সমালোচনার মুখে পড়ছে। এই ক্ষোভ ও সমালোচনার মধ্যেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর প্রায় দেড় দশক পরও সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার সেই অর্থে বাড়েনি।
বিচারপতি কাজী ইবাদুল হক এবং বিচারপতি মো. হামিদুল হক সমন্বয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ফৌজদারি মামলায় বাংলায় রায় দেওয়ার পর তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনো উচ্চ আদালতে ইংরেজিতে রায় দেওয়া হচ্ছে।
২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, বিভিন্ন দপ্তরের নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে। কিন্তু তা না হওয়ায় গত বছরের ১৮ আগস্ট আদালত মন্তব্য করেন যে, বাংলা ব্যবহারে দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাবাকোর নির্দেশমালায় বলা হয়েছে, ‘নথিপত্রে বাংলা ব্যবহার না করার বিষয়টি শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ বলিয়া গণ্য হইবে।’ বাংলা ভাষা প্রচলন আইনেও বলা আছে, আইনটি অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাবাকোর একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাঁদের জানামতে, এ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে আইন অমান্য করায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক বলেন, ‘বাংলার ব্যবহার নিয়ে প্রায় সবক্ষেত্রে অদ্ভুত উদাসীনতা, অবহেলা ও সদিচ্ছার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। নইলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আদালতের নির্দেশসহ এত সব উদ্যোগ থাকার পরও বাংলা ব্যবহার এভাবে কমে যেত না।’ তিনি মনে করেন, পঞ্চাশ, ষাট এমনকি সত্তরের দশকের তুলনায় বাংলার ব্যবহার কমেছে এবং রাষ্ট্রভাষার প্রতি অবজ্ঞা বেড়েছে।