/৭ই মার্চ মহাকাব্যের জন্ম

৭ই মার্চ মহাকাব্যের জন্ম

৭ই মার্চ, ১৯৭১। বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে পূর্ববাংলার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির বাণী ঘোষণা করেন। ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ এই মহান উচ্চারণের মধ্যেই ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল জাতির মুক্তির পথ।
রোমান নেতা জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর মার্ক অ্যান্টনির ভাষণ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের চেয়েও ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেশি গুরুত্ববাহী ও হৃদয়গ্রাহী। মহাকাব্যিক দ্যোতনায় সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল জাতির মুক্তির সনদ।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ববাংলার মানুষ শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে তাদের নয়া উপনিবেশে পরিণত করতে সচেষ্ট ছিল প্রথম থেকেই। তারা একের পর এক বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ সব ন্যায্য অধিকারের ওপর আঘাত হানছিল। পূর্ববাংলাকে শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছিল। চাকরি, শিক্ষা, ক্রীড়া, সবদিক থেকেই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছিল বাঙালি জাতির সঙ্গে। যদিও পাকিস্তানে বাঙালিরাই ছিল সংখ্যাগুরু, তবু সংখ্যালঘু পাঞ্জাবি ও অন্য অবাঙালি শাসকরা কুক্ষিগত করে রেখেছিল সব ক্ষমতা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ আন্দোলন করেছে পূর্ববাংলার মানুষ। এভাবে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তত হয়েছে জাতি। সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর আর কোনো পথ নেই একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সকলের কাছেই। ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পূর্ববাংলার মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ন্যায্য দাবিদার হন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তার সহযোগী পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো ষড়যন্ত্র করেন যে কিছুতেই বাঙালির হাতে শাসনভার দেওয়া চলবে না। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের প্রথম থেকেই নতুনভাবে শুরু হয় গণ-আন্দোলন। ৩ মার্চেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েত হবে।
৭ই মার্চের এই গণজমায়েতের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বাঙালি জাতি। অবশেষে ৭ই মার্চে গণসমুদ্রে পরিণত হয় বিশাল রেসকোর্স ময়দান। ঢাকার মানুষ তো বটেই, পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও এই সমাবেশে অংশ নিতে হাজির হয় জনতা। প্রাণপ্রিয় নেতার নিজের মুখে তারা শুনতে চায় চূড়ান্ত নির্দেশ। বঙ্গবন্ধু যখন মঞ্চে উঠে দাঁড়ান তখন উত্তাল জনসমুদ্র স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সেদিন বঙ্গবন্ধু কোনো লিখিত ভাষণ পাঠ করেননি। পাঠ করেননি চিরাচরিত কোনো বক্তৃতা। সেদিন সেই ক্ষণে যেন তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বাঙালির প্রাণের দাবি। তিনি বজ্রনির্ঘোষে উচ্চারণ করেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তাহলে আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলÑ বাংলার প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ বস্তুত এই ভাষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়ে দেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন সামরিক জান্তা তাকে হয়তো অচিরেই গ্রেপ্তার করবে বা হত্যা করবে, তাই তিনি বলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি।’ তিনি প্রকৃতপক্ষে তখনই স্বাধীনতার জন্য জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। ‘আমরা ওদের ভাতে মারব, পানিতে মারব। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, আমরা মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।’ বঙ্গবন্ধুর এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। বীর বাঙালি তাদের প্রিয় নেতার আদেশ বুকে নিয়ে অস্ত্র হাতে মোকাবিলা করেছিল চরম শত্রুর। বাংলার মাটি যে সত্যিই দুর্জয় ঘাঁটি তা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে হাড়ে হাড়ে বুঝে নিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার শত্রু।
২৫ মার্চের ভয়াল গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথমলগ্নে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তার প্রকৃত প্রারম্ভ ছিল ৭ই মার্চে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সেই ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ই ছিল প্রকৃত পক্ষে বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণা। বাঙালির ইতিহাসে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন মহাকাব্য আর কেউ কোনোদিন উচ্চারণ করতে পারেননি, আর কখনো এমন মহাকাব্য উচ্চারণ করা সম্ভব নয়।
কর্মসূচি
দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দলটির দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৭ মার্চ ভোর সাড়ে ছয়টায় ধানম-ির বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় এবং দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল সাতটায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল আটটায় দেশের সব ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, উপজেলা, মহানগর ও জেলাগুলোর পাড়া-মহল্লায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হবে। একই সঙ্গে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে আজ বিকাল ৩টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক এই দিনটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি টিভি-সংবাদপত্রগুলো দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে ১ মার্চ অপর এক ঘোষণায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভায় তিনি সারা পূর্ববাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসমুদ্রে ভাষণ দেন।
ওই ভাষণের শেষ অংশে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
৭ মার্চ তার এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। এর পরই মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রনিনাদে মহামুক্তির আনন্দে বাঙালি জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় মুক্তির লক্ষ্যে।
এদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ওপর লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা অগ্রণী রিসার্চ ‘৭ মার্চ রিসার্চ প্রজেক্ট’ হাতে নিয়েছে। এ গবেষণার লক্ষ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অর্জনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব এবং প্রভাব নির্ণয় করা। বিশ্বের অন্যান্য শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের তুলনার মাধ্যমে ইতিহাসে এর স্থান নির্ণয় করতে চান তারা।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন !