অগোচরে থাকা মানুষের করোনা দুর্ভোগ লাঘবে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার সমাজের সকল শ্রেণী এমনকি যারা অবহেলিত এবং অগোচরে থেকে যায় তাঁদেরও যাতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কোন কষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘যাঁরা সমাজের সকলের দৃষ্টিগোচর হয় না, অগোচরেই থেকে যায় সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুঃখ-কষ্টও যাতে একটু লাঘব করা যায় সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাদের কাছে কিছু (খাবার) পৌঁছে দেয়া এবং তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।’

করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিটি মানুষের খবর নিয়ে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছানো, তাদের বাড়িতে কিছু নগদ টাকার ব্যবস্থা করা, এমনকি এতিমখানা ও মসজিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গার মানুষ এমনকি রিকশার পেছনে যারা চিত্র এঁকে জীবিকা নির্বাহ করে, সাংস্কৃতিক কর্মী বা সাংবাদিক প্রত্যেককে খুঁজে খুঁজে বের করে আমরা সাহায্য করছি।’

শিল্পীদের পাশাপাশি সহ-শিল্পীদেরকেও যেন সহায়তা দেয়া হয় সেজন্য তাঁর সরকার ইতোমধ্যেই তথ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা আজ বিকেলে একাদশ জাতীয় সংসদের ৮ম (বাজেট) অধিবেশনে প্রয়াত সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লার মৃত্যুতে গৃহীত শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে একথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনার মধ্যে আসলো আবার ঘুর্ণিঝড় আম্পান। তখনো আমরা প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসি। শিশু থেকে শুরু করে ৬ লাখ গৃহপালিত পশু-পাখিকে আশ্রয় এবং খাদ্যের ব্যবস্থা আমরা করেছি। সবই করেছি এই করোনাভাইরাসের নিয়ম মেনে।’

এক্ষেত্রে প্রশাসন, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশ¯্রবাহিনী, আনসার-ভিডিপি, বিজিবি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা প্রত্যেকেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

‘তাঁর সরকার জেলা প্রশাসনের কাছেও বিরাট ফান্ড দিয়ে রেখেছে,’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাতে একজন মানুষও না খেয়ে কষ্ট না পায়। শুধু নিয়ম মাফিক নয়, ভিন্ন ভিন্নভাবেও আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।’

স্বাধীনতার পর পরই দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতির পিতার প্রায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলার প্রসংগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেই ভলান্টিয়ার এখনও রয়েছে। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই আমরা ক্ষয়-ক্ষতি হলেও অনেক মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে পেরেছি। এমনকি প্রতিবন্ধীদেরও নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা সরকার করেছে।’

সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খন্দকার আসাদুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম, সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান রেজা, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপির সহধর্মিণী বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগম, সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপির সহধর্মিণী আনোয়ারা রাব্বী এবং সাবেক গণপরিষদ সদস্য জহিরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের মৃত্যুতেও জাতীয় সংসদ শোক প্রকাশ করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন গণতন্ত্র ছিল না তখন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা সাহসিকতার সঙ্গে সংগ্রাম করে গেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছেন আজকে একে একে সবাই মৃত্যুবরণ করছেন। তাদেরকে আমরা হারাচ্ছি আর মনে হচ্ছে যেন ইতিহাসের এক একটি পাতা হারিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমার সহমর্মিতা জানাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন এমন একটা সময় অতিবাহিত করছি যখন করোনাভাইরাসের কারণে সমগ্র বিশ^জুড়েই অচলাবস্থা চলছে। পাশাপাশি মৃত্যু এসে হানা দিচ্ছে। যদিও এখানে সুস্থতার সংখ্যা অনেক বেশি তারপরও মানুষের ভেতরে এক ধরনের আতংক বিরাজমান।’

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস যেন আজকে সবচেয়ে শক্তিশালী। আর প্রকৃতি যেন তাঁর প্রতিশোধ নিচ্ছে’।
তিনি প্রয়াত সাংসদদের জন্য জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা অনুষ্ঠানের অতীত রেওয়াজ স্মরণ করে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের অনেক বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা চলে গেলেন যাঁদের জানাজাও আমরা পড়তে পারলাম না।

তাঁদেরকে আমরা দেখতে যেতে পারিনি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে যে যাব বা তাদের ডেকে এনে যে একটু সহানুভূতি জানাব, সেটাও করতে পারিনি।’
শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দলের বেগম মতিয়া চৌধুরী, আ স ম ফিরোজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, জাসদের হাসানুল হক ইনু ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ।
এছাড়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশে-বিদেশে যেসব ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন ও পুলিশের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়ী ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী মারা গেছেন, তাদের জন্য সংসদে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।

শোক প্রস্তাবের উপর আলোচনা শেষে মৃতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এর আগে তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় বিরোধীদলের চিপ হুইপ জাতীয় পার্টির মশিউর রহমান রাঙ্গা করোনার কারণে প্রধানমন্ত্রী সংসদে না এসে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে অধিবেশনে অংশ নিতে পারেন বলে মত দেন।

প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে করোনাভাইরাস কিংবা বুলেট কোন মৃত্যু ভয়েই তিনি ভীত নন বলে দৃপ্ত কন্ঠে সকলকে জানিয়ে দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসে, গুলি খেয়ে অথবা অসুস্থ হয়ে মরি, মরতেতো একদিন হবেই। এই মৃত্যু যখন অবধারিত সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি ভয় পাইনি। কখনো ভয় পাবো না।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হওয়ার পর দেশে ফেরার সময়ের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশে ফিরে আসি, সেটা ছিল সেই বাংলাদেশ, যেখানে আমার মা-বাবা, ভাই, বোন, শিশু ভাইটিকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছিল। আমার বাবা, মাসহ পরিবারের সবাইকে মারা হয়েছিল। যারা মেরেছিল তারাই ক্ষমতায় ছিল। আমি যদি ভয় পেতাম তাহলে দেশে ফিরে আসতাম না। ’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের বহু সদস্য বুলেটবিদ্ধ হয়েছিল। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বুলেটবিদ্ধ বা স্পিপ্লন্টার নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আল্লাহ জীবন দিয়েছে, আল্লাহ নিয়ে যাবে। এটাই আমি বিশ্বাস করি। যতক্ষণ বেঁচে আছি কাজ করে যাবো। করোনার মধ্যে আমরা বাজেট দিচ্ছি। অনেকে (অনেক দেশ) বাজেট দিতে পারছে না। কিন্তু আমি বলেছি, বাজেট দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি তো বেঁচে থাকতে আসিনি। বাংলার মানুষের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে এসেছি। ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই।’

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতেও দেশের জন্য এবং মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

করোনায় কাজ হারানোদের জন্য তাঁর সরকারের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে সবার কাজ করার সুযোগ ছিল না। যারা নিয়মিত চাকরির বেতন পান তার বাইরে কিছু লোক থাকেন, যারা ছোটখাটো কাজ এবং ব্যবসা করে খান। এই মানুষদে খবর নিয়ে তাদের ঘরে ঘরে খাবার দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের নেতাকর্মীসহ বিত্তশালী সবাই অসহায় মানুষদের সাহায্য করছে।’
তিনি উদাহারণ দিয়ে বলেন, ‘করোনায় মৃত ব্যক্তিকে অনেক পরিবারের লোক দাফন করতে সাহস পাচ্ছে না। মৃতদেহ ফেলে চলে যাচ্ছে। পুলিশ নিয়ে তাদের দাফন করছে। ছাত্রলীগের কর্মীরা দাফন করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ কর্মীরা। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

প্রয়াত সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান মোল্লা,সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খন্দকার আসাদুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ বেগম, জাতীয় অধ্যাপক ড.আনিসুজ্জামান এবং ড.জামিলুর রেজা চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপির সহধর্মিণী বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং ’৭৫ এর ১৫ আগষ্টে গুলিবিদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহান আরা বেগমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁদের সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন স্মৃতি সম্পর্কে আলোকপাত করেন এবং গণআন্দোলনসহ দেশ মাতৃকার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তাঁদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। সকলের রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতিও সমবেদনা জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap