করোনা আক্রান্তে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উল্টো চিত্র বাংলাদেশে

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বয়স বিবেচনায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রায় উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ বয়স বিন্যাসজনিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, করোনাভাইরাস সংক্রমিত বৈশ্বিক হারে সর্বোচ্চ আক্রান্তরা হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সীরা।

এর পরেই রয়েছে ৬০ থেকে ৬৯ ও ৪০ থেকে ৪৯ বয়সের মানুষ। এর পরের স্তরে রয়েছে ৩০ থেকে ৩৯ ও ৭০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীরা। অবশ্য নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার বিশ্বজুড়েই বেশি।

বয়সভিত্তিক আক্রান্তের হার বিশ্লেষণ করে সর্বশেষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ দপ্তরের তৈরি করা প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সের মানুষ। এর পরই রয়েছে ১৫ থেকে ২৪ বছর ও ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা। এদিক থেকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত বা কম আক্রান্ত পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা এবং ৬৪ বছরের বেশি বয়সীরা।

তবে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক চিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশ মিল রয়েছে। উন্নত বিশ্বের মতো সর্বোচ্চ মৃত্যু ষাটোর্ধ্ব মানুষের। সেই তুলনায় নিচের বয়সীদের মৃত্যুহার অনেক কম।

সর্বোচ্চ আক্রান্ত হিসেবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রান্তের সংখ্যাকে ভিত্তি করেই বিভিন্ন হার বিভাজন করা হয়। বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম থাকায় বয়স বিন্যাসে তার প্রভাব খুবই কম।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে বেশি ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীরা। এরপর আছেন ৮৫ বছরের ওপরের বয়স্ক মানুষ। এর পরের ঘরে রয়েছেন ৫৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষ। এ ক্ষেত্রেও নারীর চেয়ে পুরুষের মৃত্যুর হার বেশি।

যদিও বৈশ্বিক হারে কিছুটা হেরফের রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। গত মাস পর্যন্ত বৈশ্বিক মৃত্যুহারে সর্বোচ্চ ২১.৯ শতাংশ দেখা গেছে ৮০-ঊর্ধ্ব মানুষের মধ্যে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ওই বয়সী মানুষের মৃত্যু কিছুটা হলেও কম।

আক্রান্তের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বয়স হার বাংলাদেশের সঙ্গে কেন মিলছে না এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে তরুণ বা যুবক বয়সের মানুষই মূলত আয়-উপার্জনের জন্য ঘরের বাইরে বের হয়। আবার পরিবারের কোনো জরুরি প্রয়োজনে এই বয়সের মানুষদের ছুটতে হয় বাইরে। একই সঙ্গে এই বয়সের মানুষেরা সাধারণত আমাদের দেশে একটানা বেশিক্ষণ বা বেশি দিন ঘরে থাকতে অভ্যস্ত নয়। ফলে তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, বয়স্কদের তুলনায় তরুণ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম হলেও এ বয়সেই যাদের মধ্যে আগে থেকেই বিভিন্ন জটিল রোগ রয়েছে তারা কিন্তু ঝুঁকিতে পড়ে যায়। তাদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, খুব সতর্কভাবে চলাফেরা করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বিশেষ করে ঘর থেকে জরুরি প্রয়োজনে বের হলেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কাজ শেষ হলে অযথা বাইরে ঘোরাফেরা না করে যত দ্রুত সম্ভব ঘরে ফিরে আসতে হবে। ঘরে এসে সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাভাইরাসের যে গতিপ্রকৃতি তাতে কাউকেই এখন সরাসরি ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। নিজের সুরক্ষা করার ক্ষেত্রে যেমন যত্নশীল হতে হবে, তেমনি পরিবারের অন্যদের সুরক্ষার দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে। অপেক্ষাকৃত তরুণ ও যুবসমাজকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে সবার আগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap