চাকরির ঝুঁকিতে বেসরকারি কর্মীরা

করোনার প্রভাবে গতিশীল বেসরকারি খাত স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। শুধু সরকারি চাকরিজীবীরা ছাড়া বাকি সবাই ঝুঁকির মধ্যে আছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতের করের টাকায় যাদের বেতন চলে, তাদের চাকরি সুরক্ষিত; কিন্তু কর দিয়েও নিজেদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে বিশাল এই জনগোষ্ঠী। এর বাইরে কৃষিসহ অসংগঠিত খাতের কর্মীরাও কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে স্বকর্মসংস্থানে জড়িতরা এখন হাত গুটিয়ে বসে আছেন।

শুধু চাকরির অনিশ্চয়তাই নয়, ইতিমধ্যে আয়ও কমে গেছে বেসরকারি খাতের কর্মীদের। পেশাভেদে বিভিন্ন হারে কমেছে আয়। করোনার এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার নানা প্রণোদনা ঘোষণা করলেও বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, ইতিমধ্যে ব্যাংক ও বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরতদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। অনেক ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেতন কমিয়ে দিয়েছে কর্মীদের। গার্মেন্টস খাত প্রণোদনা নেওয়ার পর জুন থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বেকার হয়ে গেছেন ৩৫০ কারখানার শ্রমিক।

ব্যবসায়-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় বিজ্ঞাপননির্ভর সংবাদপত্র শিল্পও ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। এসব শিল্পের বিশাল কর্মিবাহিনী অজানা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো বেতন-ভাতাও প্রদান করতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই শুরু করলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তবে পোশাকশিল্পে শ্রমিক ছাঁটাই বিষয়ে বিজিএমইএ জানিয়েছে, জুন থেকে শ্রমিক ছাঁটাই না করে উপায় থাকবে না। যদিও এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পোশাক খাতে প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। পোশাক খাতের মালিকদের যুক্তি, চলতি অর্থবছরের আট মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ। গত মে মাসের প্রথম ২০ দিনে পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। কোভিড-১৯-এর কারণে অনেক বড়ো বড়ো ক্রেতা দেউলিয়াও হয়ে গেছে।

উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, সামনের দিনগুলো শুধু পোশাকশিল্পই নয়, সব শিল্প খাতের জন্য আরো চ্যালেঞ্জিং হবে। দেশে টেক্সটাইল শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংকটে পড়ে গেছে এই শিল্প। কারখানা বন্ধ, ব্যবসা না থাকায় কর্মীদের চাকরি হারানোর শঙ্কা বেড়েছে। একইভাবে অন্যান্য শিল্প খাতেও একই হাল। এ অবস্থায় বেকারত্বের দীর্ঘ সারি বিদ্যমান রেখে নতুন করে কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টি নীতিনির্ধারকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিটি ঘরে অন্তত এক জন করে চাকরি নিশ্চিত করার বদলে এখন চাকরি হারানোর আতঙ্কে সবাই। প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতনরাই শুধু নন, নিম্নপদে কর্মরতরাও চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বাংলাদেশের নামকরা কোনো কোনো করপোরেট হাউজও ঈদের আগে বেতন-ভাতা প্রদান করেনি। যদিও করোনাকালীন আর্থিক নিশ্চয়তার বিষয়টি বেশি জরুরি ছিল।

শহরের মানুষের আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ

গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘কোভিড-১৯-এর সময় জীবিকা, ক্ষতি ও সহায়তা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে শহরের মানুষের আয় ৭৫ শতাংশ এবং গ্রামের মানুষের আয় ৬২ শতাংশ কমেছে। কর্মহীন হয়ে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ। করোনার আগে দরিদ্র ছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে করোনার কারণে ৭ কোটি মানুষ কর্মহীন এবং দারিদ্র্যসীমায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সরকারি হিসাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনার কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে হবে ৪৩ শতাংশ। করোনার কারণে অতিদরিদ্রের ৭৩ শতাংশ, মধ্যম দরিদ্রের ৭৫ শতাংশ, দারিদ্র্যসীমার বাইরে কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ৬৭ শতাংশ, দারিদ্র্যসীমার বাইরের মানুষের রোজগার ৬৫ শতাংশ কমে গেছে। পেশাওয়ারি সবচেয়ে বেশি রোজগার কমেছে রেস্তোরাঁর কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ। রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছেন ভাঙারির কর্মীরা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশাচালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুরের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। শিল্পীসমাজের আয়ও কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানার কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ।

এছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষিশ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ, দোকান, সেলুন, পার্লারের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ। পোশাককর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ।

অপর এক জরিপে দেখা যায়, কোভিড-১৯-এর কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বহুবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে এক জন সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, করোনার এই সময়েই আগামী বছরের বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এই বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা যায়। করোনার কারণে আয় কমে যাওয়া মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সঠিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap