বাংলাদেশে আসন্ন করোনা ঝড় : এপ্রিলের সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করবে আমাদের জীবন মরণ

করোনা ভাইরাসের আঘাতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থারও নাজেহাল অবস্থা দেখতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে। অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো সীমিত বিশ্বায়ন অনেকটা আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে অনুন্নত বিশ্বের দেশগুলোর জন্য। এ দেশগুলোর স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানো এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ এখনই।

এখন আসি ভাইরাস প্রসঙ্গে। যেহেতু পেশাগতভাবে আমি ইমিউনলজি নিয়ে গবেষণা ও কাজ করি, সেহেতু করোনা ভাইরাস সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলতে হয়। যেমন তাপমাত্রার প্রভাব, ভাইরাসের অতিক্রম করা দূরত্ব, সংক্রামণশীলতার মাধ্যম এবং স্থায়িত্ব, কেন বয়স্করা বেশী আক্রান্ত হয়, কিভাবে করোনা রোগটি তৈরি করে, কেন রোগীর ইমিউনো সিস্টেম ভাইরাসের সাথে যুদ্ধে জিতে যায় বা হারে কিংবা আমরা কিভাবে ঔষধ বা ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারি। আবার যদি ভ্যাকসিন তৈরি করতেও পারি, তাহলে সেটা কিভাবে কাজ করবে বা আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে, কেন ভিসিজি ভ্যাকসিন তেমন একটা কোন কাজে আসার কথা না, আবার করোনা ভাইরাস নতুন কোন রূপে আসতে পারে কিনা ইত্যাদি। এসব অসংখ্য প্রশ্ন কেবল বিশেষজ্ঞ নয়, সাধারণ মানুষের মাঝেও দেখা দিয়েছে।

এখানে, একটি সাধারণ গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে বাংলাদেশে করোনার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ করব। আরএনএ করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের শতকরা ৬০ ভাগ পর্যন্ত আক্রান্ত কোন রকম উপসর্গ প্রকাশ করা ছাড়া ভাইরাস ছড়াতে পারে। এমতাবস্থায়, ১৬ কোটি মানুষের অপ্রতুল (প্রতি ১০০০০ জনের জন্য মাত্র ৩ জন চিকিৎসক ) স্বাস্থ্য খাত নিয়ে করোনা ভাইরাসের সম্মুখীন হলে, বিনা দ্বিধায় হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখে ছুড়ে ফেলা হবে, কিন্তু সেটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে ? বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সের মাঝে, যাদের খুব শক্তিশালী ইমিউনিটি সিস্টেম আছে। আশা করছি , তাদের দেহে করোনা ভাইরাস খুব বেশী মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারবে না, যদিও তারাই করোনার প্রধান বাহক এবং সংক্রামণ ছড়াতে মূল ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ব ব্যাপী উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব দেশগুলোসহ আজকে পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের মৃত্যুর হার ৬ %। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মৃত্যুর হার ৬.৫ % , তাই অতি রক্ষণশীল আমিও বাংলাদেশে নুন্যতম ১ % মৃত্যুর বাস্তবতা মেনে নিয়ে বাকি হিসাব করছি।

তার মানে, আমরা আশা করছি , প্রতি ১০০ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর মাঝে ১ জন মারা যাবে। সাধারণত, একজন ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়া পর্যন্ত সময় নেয় ২ – ৫ দিন। আর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ২৪ দিনের মতো সময় নেয়।

এখন আসি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু হয় ১৯ শে মার্চ। আমরা প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত করি মার্চের ৮ তারিখে, কিন্তু ২৫শে মার্চ পর্যন্ত, আমাদের করোনা আক্রান্ত ৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। সে হিসেবে, পহেলা মার্চ আমাদের রোগীর সংখ্যা ছিল অন্তত ৫০০ জন ( ১/১০০)। যদিও আমেরিকা এবং ইতালিতে প্রতি ৩ দিনে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, তবুও আমাদের প্রথম দিকের সরকারি হিসেবে প্রতি ৫ দিনে রোগীর সংখ্যাকে দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কার্যত ২৬শে মার্চ থেকে সারা দেশে ছুটি ঘোষণা করে, যা এখন ১৪ই এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সরকারি ছুটিতে দেশ জুড়ে মানুষের চলাচল খানিকটা সীমিত হলেও, সংক্রামণ ছড়ানো বন্ধ করার মতো অবস্থায় আসেনি। অবশ্য, ৯ই এপ্রিল বিকেল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ২১ জন মারা গেছে। তার মানে, ১৭ই মার্চ আমাদের দেশে ২১০০ রোগী ছিল (১% মৃত্যুর হার)। সে হিসেবে, ২৬শে মার্চ ছুটি শুরুর দিন আমাদের করোনা আক্রান্ত রোগী ছিল ১০,৮৩৫ জন এবং এপ্রিলের ১৮ তারিখ নাগাদ ১০৮ জন রোগী মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন, সরকার যেহেতু দেশে সব কিছু বন্ধ করেনি, অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মযজ্ঞ চলছে, সেহেতু প্রতিদিনের সংক্রমণের হার ২০ ভাগ থেকে ৫ ভাগে নামিয়ে আনি। ৫ ভাগ সংক্রমণের হিসেবে, এপ্রিলের ১৪ তারিখ পর্যন্ত আমাদের করোনা আক্রান্ত রোগীর পরিমাণ সমগ্র দেশে হবে প্রায় ২৭,৩৮০ হাজার (মৃতের সংখ্যা ২৭৩ )।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সকল জনসমাগম নিষিদ্ধ করলে ভাইরাসের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে সীমিত করা সম্ভব। সে হিসেবে, বাংলাদেশে অন্তত এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত সকল জনসমাগম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলেই শুধুমাত্র করোনা ভাইরাস অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব। যদি সরকার আরও কঠোরভাবে জনসমাগম নিষিদ্ধ করে, তবে এপ্রিলের শেষ নাগাদ প্রায় ৫৯৭৬৮ করোনা আক্রান্ত (তার মাঝে অর্ধেকের বেশী উপসর্গ বিহীন, মৃত ৫৯৭) হবে, তার মাঝে অনেকেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করবে এবং আমরা মোট ৫৯৭ জনের মৃত্যুর মাধ্যমে এই ভাইরাসের অধ্যায় সম্ভবত সমাপ্ত করতে পারব (এবারের মতো)।

এখন, যদি সরকার মনে করে, যেহেতু ২০ দিনের বন্ধ যথেষ্ট হবে এবং ১৫ই এপ্রিল থেকে সকল জনসমাগমের অনুমতি দেয় তাহলে করোনা ভাইরাস আবার ২০ ভাগ হারে প্রতিদিন বাড়বে। সে হিসেবে, এপ্রিলের শেষে আমাদের রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৪,৪২,৯৫০ জন (উপসর্গসহ বা বিহীন) (মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪,৪২৯ জন) এবং অতঃপর, ভাইরাসের সংক্রামণ দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এক কথায়, উপরোক্ত মডেলিংয়ের সার সংক্ষেপ হচ্ছে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ – ১। সরকার যদি দেশ ব্যাপী ছুটি ঘোষণা না করত, তবে মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ৬৪,০০২,০৮ জন (মৃতের সংখ্যা ৬৪,০০২ জন) , ২। ২৬ শে মার্চ থেকে দেশব্যাপী চলা ছুটি যদি এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে, তবে আক্রান্ত ব্যাক্তির সংখ্যা হবে ৫৯,৭৬৮ ( মৃতের সংখ্যা ৫৯৭ জন )। তথাপি, আক্রান্তের সংখ্যা কমবে ৬৩,৪০৪,৪০ জন, এবং ৩। সরকার যদি ২৬ শে মার্চের ছুটি ১৪ ই এপ্রিল নাগাদ শেষ করে দেয় এবং অতঃপর জন সমাগমের অনুমতি দেয়, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা হবে ৪,৪২,৯৫০ জন (মৃতের সংখ্যা ৪,৪২৯ জন)।

এখানে ব্যবহৃত সকল মডেলিং করা হয়েছে অনেকটা রক্ষণশীল এবং অনেকগুলো বাস্তবভিত্তিক হিসাব বাদ দিয়ে। তার মাঝে অন্যতম বিষয়, যেগুলো নিমেষেই এই মডেলিং এর হিসাব থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়াতে পারে, ধর্মীয় উপাসনালয়ে জামায়াত, জাতীয় বিভিন্ন উৎসবে জন সমাবেশ, গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়া ইত্যাদি।

তথাপি, আমি আশা করছি, আমাদের দেশের সরকার, জনতার জীবন এবং দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার একান্ত সদিচ্ছায়, এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত, দেশের সমস্ত পেশার ( জরুরী সেবা ভিন্ন ) মানুষকে বাসায় থাকতে উৎসাহিত অথবা বাধ্য করবেন, সবার ঘরে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দিবেন, করোনা আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা এবং আনুষঙ্গিক সেবা নিশ্চিত করবেন। একমাত্র তখনই সম্ভব হবে, করোনা নামক মহামারী থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচানো ।

ঘরে থাকব, করোনা কে হারাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap