ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখুন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদাহরণ দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের করা একটি তালিকায় কিশোরগঞ্জে ১ নম্বর সন্ত্রাসী হিসেবে জিল্লুর রহমানের নাম ছিল। এরপর ছিল আবদুল হামিদেরও (রাষ্ট্রপতি) নাম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এটি অমিট করতে বলেছিলাম। এরপরও এগুলোর তো রেকর্ড থেকেই যায়। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ওই সব রেকর্ড ও তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল।
——————
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এটি অজ্ঞতাপ্রসূত। এটি খুব খারাপ কাজ হয়েছে। এই তালিকা রাজাকারের তালিকা হতে পারে না। কেননা রাজাকার, আলবদর ও আলশামসরা গেজেটেড। এ নিয়ে যারা দুঃখ পেয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন- তারা শান্ত হোন, ধৈর্য ধরুন। যাচাই-বাছাই করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কীভাবে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে এলো, কীভাবে সেটা ওয়েবসাইটে প্রকাশ হলো- সেটা রহস্যজনক। তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটা গোলমাল করে ফেলেছে। এই তালিকা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা, তারা কোনোদিনও রাজাকারের তালিকায় থাকতে পারেন না। এটি অসম্ভব, এটি হতে পারে না।

বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এটি খুব কষ্টের বিষয়। যার পরিবারের সদস্য শহীদ হয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন- তাদেরই যদি রাজাকার শব্দটি শুনতে হয়, তাহলে খারাপ লাগারই কথা। তবে যারা কষ্ট পেয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন, তাদের বলব- কষ্ট পাবেন না। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারের খেতাব দেওয়া হবে না, এটা অসম্ভব। যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার, তারা আমাদের কাছে সর্বজনশ্রদ্ধেয়। জাতির কাছে সর্বজনশ্রদ্ধেয়। তাদের এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে এ ঘটনায় আমারও দায় আছে। আমার আরও শক্তভাবে বিষয়টি দেখা উচিত ছিল। তারপরও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে আগেই বলেছিলাম, এটি নিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না। তালিকাগুলো নিয়ে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। এরপরও এটি হয়ে গেছে। এখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি।’

তিনি বলেন, এত তাড়াতাড়ি এটি প্রকাশ করার কথা নয়। তাও আবার বিজয় দিবসের আগে। এত সুন্দর বিজয় দিবস উদযাপন করলাম, কিন্তু শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এতে কষ্ট পেয়েছেন। তারা আনন্দ নিয়ে বিজয় দিবস পালন করতে পারেননি। তালিকাটি সময় নিয়ে প্রকাশ করা দরকার ছিল।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, রাজাকারদের তালিকা করতে গিয়ে স্বাধীনতার পর যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তাদের তালিকাও ঢুকে পড়েছে। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতাসহ তাদের অনেককেই পাকিস্তান সরকার দুর্বৃত্ত ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা দিয়েছিল। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এই তালিকা নিয়েই অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, নির্যাতন করেছে। যাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের নেতাদের তালিকা ধরে ধরে কষ্ট দিয়েছেন। এরশাদের সময়ও এটি ব্যবহার করা হয়েছে। খালেদা জিয়াও এটি অব্যাহত রেখেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা উদাহরণ দিয়ে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের করা একটি তালিকায় কিশোরগঞ্জে ১ নম্বর সন্ত্রাসী হিসেবে জিল্লুর রহমানের নাম ছিল। এরপর ছিল আবদুল হামিদেরও (রাষ্ট্রপতি) নাম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এটি অমিট করতে বলেছিলাম। এরপরও এগুলোর তো রেকর্ড থেকেই যায়। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ওই সব রেকর্ড ও তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মুক্তিযোদ্ধা, এ রকম এক হাজারজনের মতো নাম তালিকায় দেওয়া হয়েছে। নামগুলো কীভাবে ওই তালিকায় গেল, এটি একটি রহস্য। রাজাকারদের তালিকা তো গেজেট করা আছে। আলবদর, আলশামস এদেরও গেজেট করা আছে। আওয়ামী লীগ সরকার যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল করেছিল, তখন ওই গেজেট থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাজেই যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তা কোনোমতেই রাজাকারের তালিকা নয়। যাদের ওই সময়ে জন্ম হয়নি, এমন অনেকের নামও তালিকায় ঢুকে গেছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যে উন্নয়ন করেছিল, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে নষ্ট করে দিয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবারও উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো নতুন করে শুরু করেছে। অগ্রগতিও ঘটেছে। এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের ধারাবাহিকতা ছিল বলেই। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।

টানা ১০ বছরে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের দারিদ্র্যের হার ২০ ভাগে নামিয়ে এনেছে। এই দারিদ্র্যের হার ১৬/১৭-তে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবো। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য যে তিনটি ক্রাইটেরিয়া দরকার- বাংলাদেশ তা এরই মধ্যে অর্জন করেছে। সামনে আর অর্জন না করলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তালিকায় থাকবে বাংলাদেশ। তারপরও সরকার লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে বদ্ধপরিকর।

সূচনা বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এ সময় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে উত্থাপনের জন্য সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট, গঠনতন্ত্রের সংশোধনী ও শোক প্রস্তাবের খসড়া অনুমোদন করা হয়। এরপর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বৈঠকটি জাতীয় সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশন পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। জাতীয় সম্মেলনের আগে এটি ছিল বর্তমান কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »
Share via
Copy link
Powered by Social Snap